খেলা

সাকিব-লিটনের ব্যাটে দিন শেষ ৫ উইকেটে ২৪২

By Daily Satkhira

February 03, 2021

খেলার খবর : প্রায় এক বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে কিছুটা ‘জড়তা’ ছিল বাংলাদেশের। প্রথম ইনিংসে প্রথম দিনের ব্যাটিংটা ঠিক মনের মতো হয়নি। তবে প্রথম দুই সেশনে টুকটাক ভুলে উইকেট বিলিয়ে আসলেও শেষ সেশনে দাপট ছিল টাইগারদেরই।

সাগরিকায় প্রথম দিনের তৃতীয় সেশনে ১ উইকেট হারিয়ে ১০২ রান যোগ করেছে বাংলাদেশ। ষষ্ঠ উইকেটে সাকিব আর লিটন এখন পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ৪৯ রানে। বাংলাদেশের সংগ্রহ ৫ উইকেটে ২৪২ রান।

ওয়ানডে সিরিজ শেষ হওয়ার পর থেকে সবার মুখে মুখে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের দীর্ঘদেহী অফস্পিনার রাহকিম কর্নওয়ালের নাম। কার্যকরী অফস্পিনে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানে ভরা বাংলাদেশি ব্যাটিং লাইনআপের জন্য ভয়ের কারণ হতে পারেন কর্নওয়াল- এমনটাই ছিল সবার শঙ্কা। কিন্তু টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের প্রথম দিন দেখা গেল ভিন্ন চিত্র।

প্রস্তুতিতে বারবার কর্নওয়ালের নাম শোনা গেলেও, মূল পরীক্ষায় বাংলাদেশের সামনে এলেন বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকান। যিনি ২০১৮ সালের সফরেও টেস্ট খেলে গেছেন বাংলাদেশ থেকে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আজ (বুধবার) সিরিজের প্রথম ম্যাচের প্রথম দিন স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তিতে ফেললেন ওয়ারিকান। বাংলাদেশের ৫ উইকেটের তিনটিই নিয়েছেন ওয়ারিকান।

তবে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচের প্রথম দিনশেষে বাংলাদেশের ব্যাটিং পারফরম্যান্সকে সবমিলিয়ে খারাপ বলা যাবে না, দীর্ঘ এক বছর পর খেলতে নেমে প্রথম দিন পুরো ৯০ ওভার কাটিয়ে ৫ উইকেটে ২৪২ রান। ফিফটির দেখা পেয়েছেন বাঁহাতি ওপেনার সাদমান ইসলাম।

ভালো শুরুর পর থেমেছেন মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহীম। তবে বড় ইনিংসের সম্ভাবনা জাগিয়ে অপরাজিত রয়েছেন লিটন দাস ও সাকিব আল হাসান।

ম্যাচে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। ব্যাট করতে নেমে কেমার রোচের করা প্রথম ওভারের প্রথম বলেই কভার দৃষ্টিনন্দন এক চার মারেন সাদমান। শেষবার বাংলাদেশের পক্ষে টেস্ট ম্যাচের প্রথম বলে চার মেরেছিলেন তামিম ইকবাল। ২০১০ সালের ঢাকা টেস্টে স্টুয়ার্ট ব্রডের বলে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ম্যাচ শুরু করেছিলেন তিনি।

শুরুর ইতিবাচকতা সেশনের বাকি সময়েও ধরে রাখেন সাদমান। দ্বিতীয় ওভারে শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের বোলিংয়ে দারুণ এক ফ্লিকে মিড উইকেট দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকান ২৫ বছর বয়সী এ বাঁহাতি। তার দেখাদেখি তামিমও রানের খাতা খোলেন চারের মারে। রোচের করা ইনিংসের তৃতীয় ওভারে কভার দিয়ে বাউন্ডারিটি হাঁকান দেশসেরা এ ওপেনার।

পরের ওভারে গ্যাব্রিয়েলের লেগস্ট্যাম্পের ওপর করা ডেলিভারির ঠিকানাও সীমানার ওপারে পাঠান তামিম। সে ওভারের পঞ্চম বলে সিঙ্গেল নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় সবার ওপরে ওঠেন তামিম। তিনি পেছনে ফেলেন ৪৪১৩ রান করা মুশফিকুর রহীমকে। যদিও এরপর আর রান করতে পারেননি তামিম। রোচের অফস্ট্যাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে লাইন মিস করে বোল্ড হন তিনি। আউট হওয়ার আগে করেন ১৫ বলে ৯ রান।

ইনিংসের পঞ্চম ওভারে মাত্র ২৩ রানের মাথায় সিনিয়র ওপেনারকে হারিয়ে চাপেই পড়ে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু তা বুঝতে দেননি সাদমান ও নাজমুল শান্ত। উইকেটে গিয়ে শান্তও রানের খাতা খোলেন চারের মারে। অফস্ট্যাম্পের বাইরে ফুল লেন্থ ডেলিভারিতে দৃষ্টিনন্দন ড্রাইভে মিডঅফ দিয়ে সীমানাছাড়া করেন শান্ত। শুরুতেই পাওয়া এ চারের আত্মবিশ্বাস নিজের ব্যাটিংয়ে জারি রাখেন তিনি।

দুই প্রান্তে সমান সাবলীলভাবে খেলতে থাকেন সাদমান ও শান্ত। অফস্পিনার রাহকিম কর্নওয়াল আক্রমণে এসে কয়েকটি ভালো ডেলিভারি করেন, কিন্তু সেগুলোতে আউট হওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। বোলারদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে ১৮তম ওভারে দলীয় পঞ্চাশ পূরণ করে বাংলাদেশ। ক্যারিবীয় বোলাররা যখন উইকেট নিতে ব্যর্থ, তখন নিজেরাই উইকেট বিলিয়ে দেয়ার পথে হাঁটেন সাদমান-শান্ত।

২৪তম ওভারের প্রথম বলে ফাইন লেগে ঠেলে দ্রুততার সঙ্গে এক রান নেন সাদমান। তিনি দ্বিতীয় রানের জন্য দৌড় শুরু করেন কিন্তু ইচ্ছা ছিল না শান্তর, তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন ক্রিজেই। কিন্তু সাদমান যখন কাছাকাছি পৌঁছে যান, তখন নিজের উইকেটটি স্যাক্রিফাইস করেন শান্ত। ফলে সম্ভাবনাময় জুটিটি ভাঙে মাত্র ৪৩ রানে। শান্তর ব্যাট থেকে আসে ৩ চারের মারে ৫৮ বলে ২৫ রান।

সেশনের পাঁচ ওভার বাকি থাকতে উইকেটে আসেন অধিনায়ক মুমিনুল। তার বিপক্ষে শর্ট বলের পশরা সাজান গ্যাব্রিয়েল। এর মধ্যে ২৮তম ওভারের তৃতীয় বলে প্রায় আউট হয়েই গেছিলেন মুমিনুল। অল্পের জন্য শর্ট লেগ ফিল্ডারের সামনে পড়ে বল, বেঁচে যান টাইগার অধিনায়ক। পরের ওভারটি নির্বিঘ্নে কাটিয়ে সেশন শেষ করে বাংলাদেশ। সাদমান ৩৩ ও মুমিনুল ২ রান নিয়ে দ্বিতীয় সেশনে খেলতে নামেন।

অধিনায়ক মুমিনুল হকের উইকেট হারালেও দ্বিতীয় সেশনটা ছিল বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণেই। কিন্তু রিভিউ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে প্রথম সেশনের মতো দ্বিতীয়টিতেও দখল হারায় টাইগাররা। শুধু সেশনের দখলই নয়, পিচে দারুণভাবে মানিয়ে নেয়া সাদমান ইসলামের উইকেট হারিয়ে নিজেদের বিপদটাও বাড়িয়ে ফেলে স্বাগতিকরা।

অথচ অভিষিক্ত আম্পায়ার শরফৌদ্দুল্লাহ সৈকতের নেয়া লেগ বিফোরের সিদ্ধান্তটি রিভিউ নিলেই বেঁচে যেতেন সাদমান, টিকে থাকত ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির সম্ভাবনা। তা হয়নি, দৃঢ় ব্যাটিংয়ে ৫৯ রান করে সাজঘরে ফিরে যেতে হয়েছে সাদমানকে। চা পানের বিরতিতে যাওয়ার সময় ৫৮ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ১৪০ রান।

ইনিংসের ৫১তম ওভারে মুমিনুল ২৬ রান করে সাজঘরে ফিরলে ব্যাটিংয়ে আসেন মুশফিক। মুখোমুখি দ্বিতীয় বলে রানের খাতা খোলেন তিনি, যা তাকে বসায় তামিমের সমান্তরালে। পরে ষষ্ঠ বলে স্ট্রেইট ড্রাইভে এক রান নিয়ে তামিমকে ছাড়িয়ে আবারও সিংহাসনে বসেন মুশফিক। বাংলাদেশের পক্ষে টেস্টে ৪ হাজার রান করা ব্যাটসম্যান এ দুজনই।

মুশফিক উইকেটে যাওয়ার আগে মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম গড়েছিলেন দুর্দান্ত জুটি। তারা দুজন মিলে ২৭.৪ ওভারে যোগ করেন ৫৩ রান। ক্যারিবীয় বোলারদের খুব একটা সুযোগ না দিয়েই এগুচ্ছিলেন তারা। শ্যানন গ্যাব্রিয়েল বাউন্সারের পশরা সাজালেও, সেগুলো দারুণভাবে সামলে নেন অধিনায়ক মুমিনুল। কিন্তু তিনি আটকা পড়েন জোমেল ওয়ারিকানের বাঁহাতি স্পিনে।

ব্যাটিংয়ে নামার পর থেকে খুব একটা হাত খুলে খেলার চেষ্টা করেননি মুমিনুল। কিন্তু ব্যক্তিগত ২০ রান পেরিয়ে যাওয়ার পরই হাওয়ায় ভাসিয়ে খেলতে শুরু করেন তিনি। পরপর দুই ওভারে দুইটি শট পড়ে খালি জায়গায়। ইনিংসের ৫১তম ওভারে ওয়ারিকানের বলে উঠিয়ে মারার চেষ্টায় শর্ট মিডউইকেটে দাঁড়ানো জন ক্যাম্পবেলের হাতে ধরা পড়েন ৯৭ বলে ২৬ রান করা মুমিনুল।

অধিনায়ক ফিরে যাওয়ার আগেই ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফিফটি তুলে নিয়েছিলেন ওপেনার সাদমান। ২০১৮ সালে নিজের অভিষেক টেস্টে এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৭৬ রান করেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচের পর আরও ১০ ইনিংস ফিফটিহীন থাকার পর আবার পঞ্চাশের দেখা পেলেন সাদমান। নিজের প্রথম ফিফটি করতে সাদমান খেলেছিলেন ১৪৭ বল, আজ তিনি মাইলফলকে পৌছেছেন ১২৮ বল খেলে।

সাদমানের ব্যাটিংয়ে কখনওই মনে হয়নি তাড়াহুড়ো করছেন তিনি। চা পানের বিরতির যখন আর মিনিট পাঁচেক সময় বাকি, তখন ওয়ারিকানের ফুল লেন্থের বলে সুইপ খেলতে গিয়ে ব্যাটে-বলে করতে পারেননি তিনি, বল গিয়ে আঘাত হানে সামনের পায়ে। ক্যারিবীয়দের জোরালো আবেদনে সাড়া দেন অভিষিক্ত আম্পায়ার সৈকত।

অগ্রজ সতীর্থ মুশফিকুর রহীমের সঙ্গে কথা বলে রিভিউ না করার সিদ্ধান্ত নেন ৬ চারের মারে ১৫৪ বলে ৫৯ রান করা সাদমান। কিন্তু টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় সেই বলটি লেগস্ট্যাম্পের প্রায় ৬ ইঞ্চি দূর দিয়ে বের হয়ে যেত। অর্থাৎ রিভিউটি নিলে বেঁচে যেতেন সাদমান এবং বাংলাদেশও বিরতিতে যেতে পারত শক্ত অবস্থানে থেকে।

তা আর হয়নি! প্রথম সেশনে ২৯ ওভারে ২ উইকেটে ৬৯ রান করার পর দ্বিতীয় সেশনেও ২৯ ওভার খেলে ৭১ রান করতে ২ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। উইকেট হারানোর ধারাবাহিকতা বজায় থাকে তৃতীয় সেশনেও। যেখানে টাইগাররা হারায় অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহীমের মূল্যবান উইকেট। বিপদ ঘটতে পারত লিটন আউট হলে। বেশ কয়েকবার ভয় জাগালেও, অপরাজিত থেকেই দিন শেষ করেন।

দিনের শেষ সেশনের প্রথম ঘণ্টায় দুর্দান্ত ব্যাটিং করছিলেন দেশের সেরা ব্যাটিং জুটি সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহীম। দুজনের ব্যাটেই ছিল বড় ইনিংসের প্রতিশ্রুতি। কখনও কর্নওয়াল, কখনও গ্যাব্রিয়েল আবার কখনও ক্যারিবীয় অধিনায়ক ক্রেইগ ব্রাথওয়েট নিজে বোলিংয়ে এসে সাকিব-মুশফিকের ধৈর্যচ্যুতির চেষ্টা করেন। কিন্তু অবিচল ছিলেন দুজনই।

তাদের জুটিতে ১৮ ওভারে আসে ৫৯ রান। ইনিংসের ৭৫তম ওভারে ওয়ারিকানের অফস্ট্যাম্পের বাইরে ফুল লেন্থের ডেলিভারিতে আউটসাইড এজ হয় মুশফিকের। নিচু হয়ে যাওয়া বলটি স্লিপে দাঁড়িয়ে দারুণ দক্ষতায় তালুবন্দী করেন রাহকিম কর্নওয়াল। বিদায়ঘণ্টা বাজে ৬৯ বলে ৩৮ রান করা মুশফিকের। তার ইনিংসে ছিল ৬টি চারের মার।

মুশফিক আউট হওয়ার ৫ ওভার পরই আসে নতুন বল। তবে নতুন বল নিয়ে ক্যারিবীয়দের চেপে বসতে দেননি সাকিব আল হাসান ও লিটন দাস। ব্যক্তিগত ২ রানের মাথায় অবশ্য ফরোয়ার্ড শর্ট লেগের হাতে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যান লিটন। এরপর আর ভুল করেননি তিনি। প্রতিটি শট খেলেছেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। অনেকটা ওয়ানডে ঘরানার ব্যাটিংয়ে রানের চাকা সচল রাখেন তিনি।

লিটন যখন উইকেটে আসেন, তখন ৫৫ বল খেলে ২৭ রানে অপরাজিত ছিলেন সাকিব। দিনের বাকি ছিল ১৫.৪ ওভার তথা ৯৪ বল। নতুন ব্যাটসম্যান হলেও দিনের শেষভাগের বেশিরভাগ বল খেলেন লিটন। দিন শেষে তিনি অপরাজিত থাকেন ৬ চারের মারে ৫৮ বলে ৩৪ রান করে। অন্যপ্রান্তে সাকিবের সংগ্রহ ৯২ বলে ৪ চারের মারে ৩৯ রান।

সংক্ষিপ্ত স্কোরঃ বাংলাদেশ ২৪২/৫(৯০.০ ওভার, তামিম ৯, সাদমান ৫৯, শান্ত ২৫, মুমিনুল ২৬, মুশফিকুর ৩৮, সাকিব ৩৯*, লিটন ৩৪*; রোচ ১/৪৪, গ্যাব্রিয়েল ০/৫১, কর্নওয়াল ০/৫৬, মায়ার্স ০/১৬, ওয়ারিকান ৩/৫৮, ব্রাথওয়েট ০/১৩)