অর্থনীতি

করোনায় কর্মহীনতা : শহরের দরিদ্রের কথা ভাবছে না সরকার

By Daily Satkhira

April 28, 2021

অনলাইন ডেস্ক : কয়েক সপ্তাহের ‘লকডাউনে’ উপার্জন প্রায় শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে রাজধানীর দিনমজুর আবদুস সোবহানের।

৪০ বছর বয়সী সোবহান ইট ভাঙার পাশাপাশি বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে মাটি বহনের কাজ করতেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ১৪ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এই সময়ে তিনি জীবিকা অর্জনের জন্য তেমন কোনো কাজই যোগাড় করতে পারেননি।

সরকার নতুন করে এই বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়িয়েছে আগামী ৫ মে পর্যন্ত। এ অবস্থায় কারও কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা ছাড়া, সামান্য আয় দিয়ে কীভাবে আগামী দিনগুলো পার করবেন তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সোবহান।

প্রায় সাত বছর ধরে মিরপুরের একটা বস্তিতে বসবাস করেন সোবহান। গতকাল তিনি বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে থাকা বুড়ো মা-বাবাকে দেখতে হয় আমাকে। এখন কোনো আয়ই যদি না থাকে, তাহলে পরিবারকে খাওয়াব কীভাবে?’

অসহায় সোবহান আরও বলেন, ‘লকডাউনের আগে আমি প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতাম। কিন্তু গত চার দিনে আয় হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা। শুনেছি সরকার খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে কিন্তু আমি এখনো সেই সাহায্য পাইনি। এ অবস্থায় কোনো কাজ ছাড়া, সরকারি সাহায্য ছাড়া আমাদের মতো মানুষ এই শহরে কীভাবে বাঁচবে?’

সোবহানের মতোই এই শহরে থাকা হাজারো দরিদ্র মানুষ চলমান লকডাউনের মধ্যে কোনো কাজ কিংবা আয়ের পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। এমনকি সরকারের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় থাকা বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

লকডাউনের মধ্যে আর্থিক সংকটে থাকা এই মানুষগুলোর অনেকে কোনো উপায় না পেয়ে সামান্য সঞ্চয় নিয়ে অথবা কোনো সঞ্চয় ছাড়াই গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

বরাবরই গ্রাম এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সুরক্ষা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বিগত কয়েক বছরে এমন সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। তবে নগরের দরিদ্ররা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক সরকারি জরিপে দেখা গেছে, খাদ্যঝুঁকিতে থাকা লাখ লাখ নগর দরিদ্র এসব সুরক্ষা প্রকল্পের আওতার বাইরে রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত এক জরিপের তথ্য অনুসারে, ন্যায্যমূল্যে খোলা বাজারে (ওএমএস) খাদ্যপণ্য বিক্রির যে কার্যক্রম চালু আছে, তাতে নগরের দরিদ্র পরিবারগুলোর মাত্র এক শতাংশ এই সুবিধা পায়। বিপরীতে বয়স্কভাতার সুবিধা পায় মাত্র দুই শতাংশ নগর দরিদ্র।

‘আরবান স্যোসিও-ইকোনোমিক অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে (ইউএসএএস) ২০১৯’ শীর্ষক ওই জরিপে বলা হয়, ‘দারিদ্র বিমোচনে সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, নগরে খাদ্যঝুঁকিতে থাকা এমন লাখ লাখ দরিদ্র মানুষ এখন পর্যন্ত আড়ালেই থেকে গেছে।’

গত বছরের আট থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে বসবাসরত দুই হাজার ১৫০টি পরিবারের ওপর বিবিএসের এই জরিপটি পরিচালিত হয়। তবে এই জরিপে করোনা মহামারির প্রভাবের বিষয়টি আসেনি।

দেশে সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ। যার মধ্যে আছে ওএমএস, বয়স্ক-বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের জন্য পেনশন সুবিধা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ধারণা, দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে নগরের শ্রমজীবী মানুষের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে, গ্রামের শ্রমজীবী শ্রেণির আয় কমেছে ১০ শতাংশ।

করোনার কারণে আরোপিত লকডাউনের ফলাফল জানতে বিআইডিএস গত বছরের জুন মাসে ‘পোভার্টি ইন দ্য টাইম অব করোনা: ট্রেন্ডস, ড্রাইভারস, ভালনারেবিলিটি অ্যান্ড পলিসি রেসপন্সেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি তৈরি করে।

নগর দরিদ্রদের জন্য নেই কোনো সুখবর :

আগামী ৫ মে পর্যন্ত বাড়ানো বিধিনিষেধের মধ্যে নগর দরিদ্রদের জন্য কোনো সুখবর নেই। কারণ এ সময়ে সরকার ওএমএস আউটলেগুলোতে ১০ টাকা কেজির কম মূল্যের চাল বিক্রি না করার ‍সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, খাদ্যশস্যের মজুদ কমে আসার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

তবে মন্ত্রণালয়ের সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম জানান, দেশব্যাপী ৮৭৪টি ট্রাকে করে খোলাবাজারে ৩০ টাকা কেজি দরের মোটা চাল বিক্রি অব্যাহত রেখেছে সরকার।

খাদ্যসচিব বলেন, ‘মজুত কমে আসার কারণে আমরা ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রি করতে পারব না। চালের বদলে নগদ প্রণোদনা দেওয়া হবে। বিষয়টা আমরা অর্থমন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি।’

চলতি বছরের ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের খাদ্যশস্যের মজুদ নেমে এসেছে চার লাখ ৬২ হাজার টনে। অথচ গত বছরের জুলাইয়ে কেবল চালের মজুদই ছিল ১১ লাখ ২০ হাজার টন। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে পয়লা জুলাই এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার টন।

খাদ্যসচিব আরও বলেন, গত বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সরকার সারাদেশের সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে ওএমএসের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজির ৮৬ হাজার টন চাল বিক্রি করেছে।

গত বছর বিবিএসের এক নিরীক্ষায় দেখা যায়, চলমান সুরক্ষা প্রকল্পগুলো চলছে অপরিকল্পিত উপায়ে। যেখানে সুবিধাভোগী বাছাইয়ের একই ভুল করা হয়েছে। আছে ফাঁক ও সমন্বয়ের অভাব।

ওই নিরীক্ষায় বলা হয়, ‘নগর এলাকাগুলোতে অনেকগুলো সুরক্ষা কার্যক্রম চালু থাকলেও এর আওতায় আসা মানুষের সংখ্যা নগণ্য।’

প্রয়োজন যথাযথ তালিকা, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় :

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় থাকা গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের সংখ্যা নগর দরিদ্রদের চাইতে অনেক বেশি। চলমান মহামারি ও লকডাউন আগে থেকেই চলা এই বৈষম্যকে আরও বেশি প্রকট করে তুলেছে।

তারা বলেন, গ্রামের মানুষের জন্য কৃষিকাজসহ উৎপাদিত পণ্য বিক্রির কিছু সুযোগ আছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়া সত্ত্বেও শহরের দরিদ্র মানুষেরা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে উচ্চমূল্যে সবকিছু কিনতে বাধ্য হন।

এ অবস্থায় দ্রুত নগরায়ণ ও অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকা বস্তিবাসীদের বিষয়টি মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞরা নগর দরিদ্রদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর জন্য স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার ভূমিকাও জরুরি বলে মত দেন তারা।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন মনে করেন, সমন্বিত হাউজহোল্ড ডাটাবেজের অভাবে নগর দরিদ্ররা সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর সুফল পায় না। তার মতে, এমন একটা ডাটাবেজ থাকলে সরকার এই মহামারির মধ্যে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারতো।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ‘বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতেই সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো পরিচালিত হওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর যূথবদ্ধতাই আমাদের শক্তি। বিশেষ করে মহামারির এই ক্রান্তিকালীন সময়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নগর এলাকাগুলোতে অনেক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কাজ করছে মন্তব্য করে বিনায়ক সেন আরও বলেন, ‘যদি সরকারের সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে এই সংস্থাগুলো যোগ দেয়, তাহলে প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।’

এদিকে, নগর দরিদ্ররা সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল যে খুব একটা পাচ্ছে না, তা স্বীকার করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন।

তিনি বলেন, ‘সরকার মহামারি ও লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত সবার জন্যই বরাদ্দ রেখেছে। এর অংশ হিসেবে নির্ধারিত নগর দরিদ্ররাও তা পাবেন। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ নামমাত্র হলেও তা বিবেচ্য না।’

একইসঙ্গে মহামারির এই সময়ে নগর দরিদ্ররা যাতে সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, তার জন্য তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে জানান ত্রাণসচিব।

তিনি বলেন, ‘বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য আমরা এখন সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের যুক্ত করছি। যাতে কাঙ্ক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে তারা আমাদের সাহায্য করতে পারে।’

সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে যুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মোহসীন বলেন, ‘এ বিষয়ে এই মুহূর্তে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই।’