রাজধানীর সদরঘাটে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক প্রাণহানির ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো বাস্তবতা? বিশ্লেষকরা বলছেন, লঞ্চের ধাক্কা হয়তো শেষ আঘাত ছিল। কিন্তু এই মৃত্যুর শুরু অনেক আগেই—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামাজিক নীরবতার মধ্যে। দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা বাড়লেও দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যে ব্যক্তি অতিরিক্ত যাত্রী তুলে জীবনের ঝুঁকি বাড়ায়, সে শিক্ষিত। যে কর্মকর্তা এসব অনিয়ম দেখেও নীরব থাকেন, তিনিও শিক্ষিত। এমনকি সাধারণ মানুষ, যারা সব দেখেও প্রতিবাদ করেন না—তারাও একই ব্যবস্থার অংশ। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—এই শিক্ষা আমাদের কী শিখিয়েছে? মানবজীবনের মূল্য বোঝাতে? আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে? নাকি দায়িত্ব নেওয়ার সাহস গড়ে তুলতে? বাস্তবতা বলছে, এর কোনোটিই যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতি বছর ঈদ এলেই ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। কিন্তু সেই যাত্রা অনেক সময়ই নিরাপদ থাকে না। অতিরিক্ত যাত্রী, অব্যবস্থাপনা ও নজরদারির অভাবে সাধারণ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়। আর সেই ঝুঁকিই অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, অবহেলাও নয়—এটি একটি সিস্টেমেটিক ব্যর্থতা। এমন একটি কাঠামোগত দুর্বলতা, যেখানে দরিদ্র মানুষের জীবনের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম ধরা হয়। আজ যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা শুধু দুর্ভাগ্যের শিকার নন। তারা আমাদের ব্যর্থতার জীবন্ত প্রমাণ—আমরা এখনো এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে মানুষ হওয়াটাই প্রথম শর্ত। এই পরিস্থিতি বদলাতে না পারলে, এবং প্রতিটি মৃত্যুকে যদি আমরা “ভাগ্য” বলে এড়িয়ে যাই, তবে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতেই থাকবে। শেষ প্রশ্ন একটাই— আর কত প্রাণ হারালে আমরা সত্যিকার অর্থে মানুষ হতে শিখব?–
লেখক : শাহিনুর রহমান