ফিচার

লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার তিন প্রবাসীর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম

By daily satkhira

May 12, 2026

নিজস্ব প্রতিনিধি : লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন সাতক্ষীরার তিন প্রবাসী বাংলাদেশি। তাঁদের মৃত্যুর খবরে সাতক্ষীরার তিনটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ বাতাস। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন দিশেহারা শফিকুলের স্ত্রী-সন্তান ও বৃদ্ধ পিতা-মাতা। অন্যদিকে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন সদ্য কৈশোর পেরোনো নাহিদের মাতা। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন নাহিদের পিতাও। একই অবস্থা নিহত শুভ দাসের বাড়িতেও। তিনটি পরিবারের মধ্যে চিন্তার ভাজ কিভাবে তারা তাদের ঋণ পরিশোধ করবেন। যদিও পরিবার গুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন।

নিহত তিনজন হলেন, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪৫), আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (৪০) এবং কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর গ্রামের সঞ্জয় দাসের পুত্র শুভ দাস (২৩)।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় একটি রুটি বহনকারী গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা হয়। ওই হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন তিন বাংলাদেশি কর্মী শফিকুল, নাহিদ এবং শুভ দাশ। তাঁরা একই এলাকায় বসবাস করতেন।

মঙ্গলবার সকালে শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের এক কোণে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তাঁর স্ত্রী রুমা খাতুন। দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, “আমার স্বামী সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল। এত টাকা ঋণ করে গেল, এখন এই ঋণ আমি কীভাবে পরিশোধ করব? আমার দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?” শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন ছেলের নাম ধরে বারবার ডাকছিলেন। কখনো বিলাপ করছেন, কখনো নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন। বৃদ্ধ বাবা আফসার আলীও শোকে বাকরুদ্ধ। ছেলের বিদেশযাত্রার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, “ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গরু বিক্রি করেছি। এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি, আত্মীয়দের কাছ থেকেও ধার করেছি। ভেবেছিলাম, ছেলে উপার্জন করে সংসারের কষ্ট দূর করবে। এখন সে লাশ হয়ে ফিরবে।”

পরিবার জানায়, গত ঈদুল ফিতরের রোজার দুই দিন পর শফিকুল ইসলাম লেবাননের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন। প্রতিবেশী নাহিদুল ইসলামের মাধ্যমে সেখানে যান তিনি। লেবাননে গিয়ে একটি ফলের বাগানের শ্রমিকের কাজ নেয়। বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রায় ১০লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, যার বেশির ভাগই ঋণ। স্থানীয় লোকজন জানান, শফিকুল ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। সংসারের অভাব ঘোচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তাঁর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবারকে অসহায় করে দিয়েছে।

ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, “শফিকুলের পরিবার অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।”

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, নিহতের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এদিকে, একই হামলায় নিহত নাহিদুল ইসলামের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। স্বজনেরা বলছেন, পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে দুই প্রবাসী প্রাণ হারালেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশে।

অপরদিকে, কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের শ্রীপতিপুর গ্রামের শুভ দাসের ‌বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। জেলার তিন যুবককের মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকা জুড়ে শোকাহত করেছে।##