নিজস্ব প্রতিনিধি : নদীর চরে বসবাসকারী ১৭টি অসহায় হিন্দু পরিবারকে উচ্ছেদ এবং তিন শতাধিক গাছ হত্যার প্রতিবাদ করে বিপাকে পড়েছেন বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম। হিন্দু অধ্যুাষিত এলাকার আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হওয়া এই জামায়াত নেতা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিত চাঁদাবাজির মামলাও। এঘটনায় উপজেলা জুড়ে চলছে নানা গুঞ্জন। তিন শতাধিক ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ কর্তনের প্রতিবাদের জেরে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এ মামলা হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীরা। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর-রাদ কর্পোরেশনের আইন কর্মকর্তা পরিচয়ে মোঃ জালাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি রোববার রাতে শ্যামনগর থানায় উক্ত মামলা করেন। যার নং- ৪৪। উপজেলা জামায়াতের সদস্য নজরুল ইসলাম শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন তীরবর্তী বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। উক্ত মামলায় নজরুল ইসলামের ছেলে আব্দুর রহমান, বিশ^জিৎ মন্ডল ও মোঃ সবুজের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামীয় ২০/২৫ জনকে আসামী করা হয়েছে। জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল রাতে সুন্দরবনসংলগ্ন খোলপেটুয়া নদীর দুর্গাবটি এলাকার চরে বেড়ে ওঠা মানগ্রোভ প্রজাতির নানা ধরনের প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটে ফেলে একদল দুর্র্বৃত্ত। এসময় রাতারাতি তারা তিনটি এসকেভেটর দিয়ে তদসংলগ্ন চরের প্রায় ১৫ একর জায়গাজুড়ে ভেড়ী আকারে রি-বাঁধ গড়ে তুলে নদীর সাথে ঐ অংশে জোয়ার-ভাটার পানি ওঠানামার সুযোগ বন্ধ করে দেয়। খবর পেয়ে পরদিন সকালে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে পরির্দশন শেষে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করে। পরক্ষনে উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভুমি) রাশেদ হোসাইন সেখানে পৌছে রাতে নির্মিত ভেড়ী অপসারণ করে পুনরায় সেখানে জোয়ার-ভাটার পানি ওঠানার সুযোগ করে দেন। তারপর থেকে উক্ত অংশে বাঁধের সংস্কার কাজ বন্ধ রাখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। একপর্যায়ে রোববার রাতে গাছ কর্তনপুর্বক চর দখলের প্রতিবাদকারী চেয়ারম্যানসহ তার লোকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়। আব্দুল আজিজ ও আইয়ুব আলীসহ স্থানীয়দের ভাষ্য আর-রাদ কপোর্রেশন নামীয় প্রতিষ্ঠানটি বুড়িগোয়ালীনি ও গাবুরা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কারের কাজ করছে। যার অংশ হিসেবে ইতিপুর্বে তারা খোলপেটুয়া নদীর অপর একটি অংশের চর দখলে নিয়ে ব্লক নির্মানের ইয়ার্ড তৈরি করেছেন। নুতন করে আরও একটি ব্লক তৈরির ইয়ার্ড গড়ার জন্য তারা রাতারাতি খোলপেটুয়া নদীর দুর্গাবাটি এলাকার চর দখল করে। এসময় সেখানে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনায়নের প্রায় তিন শতাধিক বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় ম্যানগ্রোভ গাছ কেটে সাবাড় করে। এছাড়া চুনকুড়ি এলাকায় নদীর চরে বসবাসকারী ১৭টি ভূমিহীন হিন্দু পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। দখল করা হয়েছে তাদের শ্মাশান। এসব বিষয় নিয়ে মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানানোর প্রেক্ষিতে আওয়ামীলীগ সরকারের সময়কালের পানি সম্পদ মন্ত্রীর “আপনজন’ পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক সবুজ খান চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামকে হয়রানী করতেই আইন কর্মকর্তাকে দিয়ে মামলা করেছেন। এসব গ্রামবাসী আরও জানান আর-রাদ কর্পোরেশন ২০২২ সাল থেকে শ্যামনগরের উপকুলীয় এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কারের কাজ করছে। ইতিপুর্বে তিনি তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাগ্নে পরিচয় দিয়ে অবৈধভাবে খোলপেটুয়া নদীর চর দখলসহ কলবাড়ি ব্রিজ সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৯০ একর জমি নামমাত্র মুল্যে লিজ নিয়ে চিংড়ি প্রকল্প গড়ে তুলেছিলেন। এবিষয়ে মামলার বাদি জালাল উদ্দিন জানান নজরুল ইসলাম ৫ আগষ্টের পর থেকে চাঁদা দাবি করছে। বাধ্য হয়ে গত ১৩ মে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়। তিনি আরও বলেন জাইকার অর্থায়নে বাঁধে সংস্কারের কাজের জন্য সরকার চর আর-রাদ কর্পোরেশনকে লিজ দিয়েছে। তবে লিজ নিলেও গাছ কাটতে পারেন কিনা-জানতে চাইলে ‘গাছগুলো একেবারে ছোট আর কেউ লাগ্য়ানি’। তিনি আরও জানান, গত চার/পাচ দিন পুর্বে তিনি ইয়ার্ডে এসে চাঁদা দাবিসহ নানাভাবে হুমকি দিয়েছেন। সবকিছুর রেকর্ড রয়েছে। তবে ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ কাটার প্রতিবাদ করা এবং ভূমিহীনদের উচ্ছেদে বাধা দেওয়ার কারণে আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলায় উল্লেখিত সময়ে ইউনিয়ন পরিষদে বাজেট মিটিং ছিলো। সে সময় বাজেট মিটিং ছিলাম। সত্যতা নিশ্চিত করে শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ খালেদুর রহমান জানান চাঁদা দাবিসহ হামলা ভাংচুরের বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে। আসামীদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে। এবিষয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা ওই মিথ্যা মামলার প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।