আজকের সেরা

সাতক্ষীরার মোখলেসকে থানায় আটক রাখা হয়েছিল, ওসি এসপি জড়িত; বিচারিক তদন্ত রিপোর্ট//তদন্ত ভার পিবিআইকে দেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের

By Daily Satkhira

July 16, 2017

ডেস্ক রিপোর্ট : সাতক্ষীরার পল্লীচিকিৎসক মোকলেসুর রহমান জনির ‘নিখোঁজের’ তদন্তভার ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে মামলায় পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে। আজ রোববার বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদউল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস। এর আগে হাইকোর্ট জনির অবস্থান নির্ণয়ে বিচারিক তদন্তের জন্য সাতক্ষীরার মুখ্য বিচারিক হাকিমকে নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হাবিবুল্লাহ মাহমুদকে ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বিচারিক তদন্ত রিপোর্টে যা আছে : পুলিশ কর্তৃক সাতক্ষীরার কুখরালীর অধিবাসী শেখ মোকলেসুর রহমান জনিকে গ্রেফতার ও তিনদিন পর্যন্ত থানায় আটকে রেখে পরবর্তীকালে অস্বীকারের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে বিচারিক তদন্ত কমিটি। এই ঘটনার সাথে সাতক্ষীরার সদর থানার তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমদাদুল হক শেখ ও এসআই হিমেল হোসেনের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তৎকালীন এসপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন কল রেকর্ড যাচাই করা সম্ভব হলে জনির বর্তমান অবস্থানসহ এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেত। তদন্তকালীন সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কর্তৃপক্ষ বরাবর সহযোগিতা চেয়েও তা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে সময় ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপকরণের অপর্যাপ্ততার কারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা ও জনির বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। আজ রবিবার বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চের দৈনন্দিন কার্যতালিকার ২৪ নম্বর ক্রমিকে বিষয়টি আদেশের জন্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। হোমিও চিকিৎসক মোকলেসুর রহমান জনির খোঁজ না পেয়ে তার স্ত্রী জেসমিন নাহার হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস রিট করেন। রিটে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট রাত ৯টার দিকে ওষুধ আনতে বাড়ি থেকে বের হয়ে সাতক্ষীরা নিউ মার্কেট এলাকায় এলে জনিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওইদিন রাত ১টায় পুলিশ জনিদের বাড়িতে অভিযান চালায়। পরদিন জেসমিন ও তার শ্বশুর থানায় গিয়ে জনির খোঁজ করেন ও তাকে থানা হাজতে দেখতে পান। পরে আরো দুইদিন থানায় আটক থাকা জনিকে খাবারও দেন। ৮ আগস্ট থানায় গেলে পুলিশ জনিকে আটক করা এবং থানায় রাখার কথা অস্বীকার করে। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদউল্লাহর ডিভিশন বেঞ্চ এ ঘটনায় প্রথমে পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জনিকে আটক বা গ্রেফতার করেনি। এছাড়া তাকে আটকের বিষয়ে থানার রেজিস্ট্রারে কোনো এন্ট্রিও নেই। এরপরই হাইকোর্ট জনির অবস্থান নির্ণয়ে বিচারিক তদন্তের জন্য সাতক্ষীরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশের প্রেক্ষিতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুল­াহ মাহমুদকে ঘটনাটি তদন্ত করে সম্প্রতি হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পুলিশের এ ধরনের আটক ও পরবর্তীতে তা অস্বীকার করার বিষয়ে সাম্প্রতিককালে যথেষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে কারো কারো লাশ পরবর্তীতে পাওয়া গেছে। কাউকে পরবর্তীতে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কাউকে বেশ কিছুদিন পর ফেরত পাওয়া গেছে। আবার কারো কারো খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। এ জাতীয় ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্ত হয়েছে বলে জানা যায়নি বলে প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা সদর থানায় জিডি করার জন্য গিয়েছিলেন জেসমিন নাহার; কিন্তু তৎকালীন ওসি ওই জিডি গ্রহণ করেননি। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের রেকর্ডও তিনি সরবরাহ করেছেন। তৎকালীন ওসি ফিরোজ মোল্লাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সে জিডি গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৭ আগস্ট গ্রেফতার হওয়া আসামি হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে জনির নাম মনে করতে পারেননি। তবে তাকে জনির ছবি দেখানো হলে চিনতে পারেন এবং তাকে থানা হাজতে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। জনির বাসা থেকে আনা খাবার দুইজনে ভাগ করে খেয়েছেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এসআই হিমেলকে জিজ্ঞাসাবাদকালে তিনি জনির পরিবারের সদস্যদের ডাকার কথা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করেননি। তবে জনি সম্পর্কে কোনো অ্যাসাইনমেন্ট তার কাছে ছিল না মর্মে তিনি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। থানার ওসি, সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার এবং ডিএসবি কর্মকর্তাসহ সকলেই জনির নামীয় কোনো অভিযোগ তাদের নিকট থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। গত ১০ আগস্ট জেসমিন ও তার পরিবারের সকল সদস্য জাতীয় পরিচয়পত্রসহ থানায় গিয়েছিলেন। জেসমিন ও এসআই হিমেলের সাথে তার কথোপকথনের অংশ মোবাইলে রেকর্ড করতে সক্ষম হন। পরে তা সিডি আকারে এই তদন্ত কমিটির কাছে একটি কপি দেওয়া হয়। রেকর্ডের সংশ্লিষ্ট অংশ মনোযোগ দিয়ে শুনলে পুলিশ কর্তৃক জনিকে আটকের বিষয়ে এটি একটি আকাট্য প্রমাণ। পরবর্তীকালে সিডির ওই কণ্ঠস্বর এসআই হিমেলের মর্মে চিনতে পেরেছেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা।

সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ জু্লাই ২০১৭