আন্তর্জাতিক

ঈদের দিনেও জ্বলছে রাখাইন রাজ্য

By Daily Satkhira

September 02, 2017

আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই জ্বলছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন গ্রাম। দেশটির সরকারি বাহিনীর সহিংসতার বলি হচ্ছেন ওই রাজ্যের হাজারও রোহিঙ্গা। সেই জ্বালাও-পোড়াও থেকে মুক্তি মেলেনি ঈদুল আজহার দিনেও। শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টার দিকে রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়া এলাকায় দেখা গেছে আগুনের ধোঁয়া। সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা বলছেন, এসময় সীমান্তের খুব কাছে গোলাগুলির শব্দও শোনা গেছে। এ কারণে সীমান্ত দিয়ে আরও বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে দেশে। এদিকে, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের নাফ নদীর মোহনা থেকে আরও এক রোহিঙ্গা নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উখিয়ার রেজু আমতলী সীমান্তে আরও এক রোহিঙ্গার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন স্থানীয়রা।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এপার-ওপারের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ১০টার দিকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কিছু লোক নিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি দল রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়া এলাকায় ঢুকে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় অভিযান শুরু করে। এক পর্যায়ে মানবশূন্য কয়েকটি গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঈদের নামাজের সময় এমন ঘটনা ঘটায় অনেকেই নামাজ ছেড়েই ছোটাছুটি করতে থাকেন। এসময় রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ চলে আসেন নো-ম্যানস ল্যান্ডে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বেশকিছু এলাকায় বাংলাদেশি মোবাইল ফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তারা বাংলাদেশি মোবাইল কোম্পানির সিম কার্ডও ব্যবহার করেন। তেমনই একজন ঢেঁকিবনিয়া ইউনিয়নের পোকপাড়া গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে আমান উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আজ (শনিবার) সকালে ঢেঁকিবনিয়া ইউনিয়নের চাকমাকাটা গ্রামের ইদ্রিস বাড়ি, ফকিরপাড়া গ্রামের মৌলভী হোসেন আহমদের বাড়িসহ ছয়টি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়াও রাখাইন রাজ্যের বলিবাজার, আয়াচর, কিয়ামং, জুম্বাই, নরিক্যাং, শীলখালী, বালুখালী, বুচিঢং, রাচিঢং, কৈয়ারবিল, নাইচং, নাইসাপ্রোসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে দেওয়া হয় আগুন। এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।’ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নাইচাপ্রো গ্রামের মোহাম্মদ আমির মোবাইল ফোনে বলেন, ‘‘সেনাবাহিনী খুব সকাল থেকে ‘নাইচাপ্রো’ গ্রামে তল্লাশি শুরু করেছে। কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, কেউ ঈদের নামাজও পড়তে পারিনি। তাই অন্যদের মতো স্বজনদের নিয়ে সীমান্তের ওপারের একটি নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছি। এখন সুযোগ পেলেই বাংলাদেশে চলে যাবো।’’ রাখাইন রাজ্যের নাইচং গ্রামের মিনারা বেগম বলেন, ‘ঈদের দিন খুব ভোরে বাংলাদেশ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে এসেছি। ভয়ভীতি নিয়েও এতদিন গ্রামেই ছিলাম। তবে রাতে তার গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় সেনাবাহিনী। তাই আজ চলে এসেছি।’ এদিকে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জলপাইতলী সীমান্তের স্থায়ী বাসিন্দা নুরুল আবছার, ঘুমধুমের মোহাম্মদ নবী ও ধামনখালী গ্রামের আবুল কালামসহ অনেকেই জানিয়েছেন, মিয়ানমারের ওপারে চলছে গুলিবর্ষণ। কিছুক্ষণ পরপর দেখা যাচ্ছে আগুনের ধোঁয়া। সীমান্তের ওপারের মানুষের আর্তচিৎকারও শুনতে পেয়েছেন তারা।

উখিয়ার পালংখালীর ইউপি সদস্য মোজাফফর আহমদ বলেন, ‘শনিবার সকাল থেকেই রাখাইন রাজ্যে দফায় দফায় গোলাগুলির শব্দ শুনেছি। দুপুর ৩টার দিকেও এমন শব্দ শুনতে পেয়েছি। এসময় সীমান্তের ওপারে রোহিঙ্গাদের চিৎকারও শোনা গেছে। রাখাইনের সীমান্ত এলাকায় ধোঁয়াও দেখেছি।’ টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘শনিবার সকাল ৮টার দিকে উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ থেকে আরও এক রোহিঙ্গা নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সকালে স্থানীয়রা খবর দিলে টেকনাফ থানার পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে নাফ নদী থেকে ৫০ জন রোহিঙ্গা নারী ও শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হলো।’

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় সে দেশের একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। এতে ১২ পুলিশ সদস্যসহ রোহিঙ্গা হতাহত হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে রোহিঙ্গারা। নাফ নদীর জলসীমানা থেকে শুরু করে স্থলসীমানা পার হয়ে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এর আগে, গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একইরকম হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসেন প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এরপর আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে মিয়ানমার সরকারের ওপর। কিন্তু, এর কোনও তোয়াক্কা না করে আরকানে ফের সেনা মোতায়েন করলে বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সে দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ।