জাতীয়

বেতন বেড়েছে, বেড়েছে ভাতাও, কমেনি সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি

By Daily Satkhira

January 11, 2018

জোগান বাড়লে দর কমে—এ হচ্ছে অর্থনীতির তত্ত্ব। প্রায় একই রকম চিন্তা করা হলো ২০১৫ সালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সময়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, নতুন কাঠামোতে বেতন দ্বিগুণ হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বাড়বে আর দুর্নীতি কমবে। ওই বছর বেতন বাড়ে, পরের বছর বেড়েছে ভাতাও। অর্থের এই জোগান বাড়ার পর দুর্নীতি কি কমেছে, অর্থনীতির ওই সূত্রের মতো! বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, না কমেনি। আর এই না কমার কথা প্রকারান্তরে স্বীকারও করে নিচ্ছেন উদ্যোগটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। খোদ অর্থমন্ত্রীই বলেছেন, ‘যাদের স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে তারা বদলাবে না।’

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নতুন চালু হওয়ায় হটলাইনে গত ২৭ জুলাই থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত অভিযোগকারী ছিল চার লাখ ১০ হাজার। দুদকে আগে জমা পড়া কয়েক বছরের অভিযোগ বিশ্লেষণ করেও দেখা যাচ্ছে সূচকটি ঊর্ধ্বমুখী। বেড়েছে দুদকের গ্রেপ্তার ও ফাঁদ মামলার সংখ্যাও। দুদকে দেওয়া অভিযোগ ২০১৫ সালে ১০ হাজার ৪১৫ এবং ২০১৬ সালে ১২ হাজার ৯৯০টি ছিল। ২০১৭ সালের অক্টোবরে এসেই তা ১৩ হাজার ৯০৩টিতে দাঁড়ায়। ২০১৫ সালে দুদকের ফাঁদ মামলা ছিল চারটি। পরের বছর তা ১৩টি হয় এবং গত অক্টোবর পর্যন্ত ২৩টি ফাঁদ মামলা হয়েছে। ২০১৫ সালে ২০ জন এবং ২০১৬ সালে ৩৮৮ জন গ্রেপ্তার ছিল। গত ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ১৮০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি আসছে; অন্য পেশার মানুষের প্রতি অভিযোগ খুবই কম।

গ্রেপ্তার হচ্ছেন কর্মকর্তারা : সরকারি খাতে দুর্নীতি কোথায় নেই! আয়বহির্ভূত ৪৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মোহাম্মদ আমিনকে গ্রেপ্তার করে দুদক। বর্তমানে তিনি জামিনে থাকলেও জনপ্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিচ্ছেন এবং নিজেকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একজন যুগ্ম সচিব হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে অভিযোগ করেছে। গত জুলাই মাসে নিজ কার্যালয়ে ঘুষের টাকাসহ দুদকের জালে ধরা পড়েন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম খায়রুল ইসলাম। নৌযানের নকশা অনুমোদনের জন্য ঘুষ লেনদেনে অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সিভিল এভিয়েশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আসির উদ্দিনকে গত ১২ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করেছে দুদক। দুর্নীতির অভিযোগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এনামুল ইসলামকে দুদক গ্রেপ্তার করে ২০১৭ সালের ২ মার্চ। পরিদর্শনের পর একটি বিদ্যালয়ের পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ার শর্ত হিসেবে ‘ঘুষ হিসেবে নেওয়া’ দুই লাখ টাকাসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাকে গত ৩০ মে গ্রেপ্তার করে দুদক। মোস্তাফিজুর রহমান নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তা তিনি। এই নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ঘুষ নিয়ে সম্প্রতি মন্তব্য করেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

সরকারি যেসব খাতে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয় সেগুলোর মধ্যে ভূমি অন্যতম। এ দেশের মামলা-মোকদ্দমার প্রায় ৮০ ভাগই ভূমিকেন্দ্রিক। কেনাবেচা, নামজারি থেকে শুরু করে হস্তান্তরের প্রতিটি ধাপে অনিয়ম করেন ভূমি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। দেশের সেবা খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এখানে সেবা নিতে গিয়ে ৭৭ শতাংশ মানুষ ঘুষের শিকার হয়। এ তথ্য দিয়ে গত বছর টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর পরই রয়েছে শিক্ষা, বিআরটিএ, বিচারিক সেবা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকারসহ ১৬টি খাত। গত অর্থবছরে সরকার রেকর্ডসংখ্যক ৮২ হাজার ৫৮৯টি পদে জনবল নিয়োগ দিয়েছে। অভিযোগ আছে এসব নিয়োগে ছিল টাকার ছড়াছড়ি। দুর্নীতি বিচারালয়েও ছড়িয়েছে। বিচারপতি কোনো আদেশ না দিলেও আসামি ও স্বার্থান্বেষীদের কারসাজিতে জাল আদেশ তৈরি হচ্ছে। দুর্নীতির জগতে এলআর (লোকাল রেভিনিউ) ফান্ড প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় এলআর ফান্ডের নামে চাঁদাবাজি করছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি : সরকারি কর্মচারীদের এখন সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা, আর সর্বনিম্ন আট হাজার ২৫০ টাকা—যা আগে ছিল ৪০ হাজার এবং চার হাজার ১০০ টাকা। বেতন বাড়ানোর পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এবার দুর্নীতি কমে যাবে। প্রায় আড়াই বছর পর অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এখনো মূল্যায়নের সময় হয়নি। মূল্যায়নের জন্য আরো একটু সময় দিতে হবে। দুর্নীতি কমতেও সময় লাগবে। যাদের স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে তারা বদলাবে না। তবে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব টের পাওয়া যায় নতুনদের মধ্যে। তারা অনেকটা পরিচ্ছন্ন।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এম হাফিজউদ্দীন খান বলেন, ‘শুধু বেতন বৃদ্ধিতে দুর্নীতি কমবে না। চাকরিতে দলীয়করণ থাকলে দুর্নীতি বাড়ে। দুর্নীতি রোধে সরকারি প্রচেষ্টাও একটা বড় বিষয়। আদালতের রায়ে গলদ ও দীর্ঘসূত্রতা থাকলে দুর্নীতি হয়। কার্যকর সংসদও দুর্নীতি কমাতে সহায়তা করে। এসব সেক্টর একসঙ্গে কাজ করলে দুর্নীতি কমবে। আমাদের এখানে কি এসব সেক্টর কার্যকর? তাহলে দুর্নীতি কিভাবে কমবে? দুর্নীতি কমাতে হলে কাজের প্রচলিত পদ্ধতি বদলাতে হবে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বেতন যদি জীবনধারণ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে দুর্নীতি কমে আসা উচিত বলে ধরা হয়। এটা প্রয়োজনীয় কিন্তু যথেষ্ট নয়। যাঁরা দুর্নীতি করেন, তাঁরা শুধু বেতন-ভাতা কম পেলেই দুর্নীতি করেন—বিষয়টি এমন নয়। অনৈতিকতা, আইনের লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদ বৃদ্ধির উপায় হিসেবেও তাঁরা দুর্নীতি করেন।’ বেতন-ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যাঁরা দুর্নীতি করছেন তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দিতে হবে। এই বিষয়গুলো পাশাপাশি হয়নি বলেই বেতন বৃদ্ধি সত্ত্বেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাই না।’

নির্ধারিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ থাকার পরও সরকারি কর্মচারীরা কেন দুর্নীতিতে জড়ান জানতে চাইলে একজন উপসচিব বলেন, এ জন্য বৈষম্যও দায়ী। একই চাকরি করে বৈধভাবে একজন গাড়ির মালিক হচ্ছেন, আর একজন বাসে ঝুলে অফিসে যাচ্ছেন। মেধা তালিকায় পেছনে থাকার পরও দলবাজির কারণে একশ্রেণির কর্মকর্তা পদোন্নতি পাচ্ছেন। বর্তমান প্রশাসন দুর্নীতির সবচেয়ে উত্কৃষ্ট ক্ষেত্র। কারণ প্রশাসনে সবগুলো বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। এই উপসচিব জানান, বেতন-ভাতা বাড়ার পরও একশ্রেণির কর্মকর্তার গাড়ি সুবিধা বেড়েছে। সচিবরা বাবুর্চি ও নিরাপত্তা প্রহরী রাখেন না। কিন্তু গত অক্টোবর থেকে সরকারের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবরা বাবুর্চি পদের বিপরীতে ১৬ হাজার টাকা কুক অ্যালাউন্স (বাবুর্চি ভাতা), নিরাপত্তা প্রহরী পদের বিপরীতে ১৬ হাজার টাকা সিকিউরিটি অ্যালাউন্স (নিরাপত্তা ভাতা) পাচ্ছেন।

দুর্নীতির যত ডালপালা : ভূমি খাতে চলা দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে খোদ ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে। সেখানে দেওয়া একটি পরিপত্রে বলা হয়েছে, ‘সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের হাতে মূলত জমির মালিকরা জিম্মি। তাঁরা মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তি দিয়ে থাকেন। তাঁরা মানুষকে জিম্মি করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।’ নরসিংদীর মনোহরদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলায় কাজ করে যাওয়া একজন সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদনে লেখেন, ‘নামজারিতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারি পুকুরের মাছ বিক্রির অভিযোগও আংশিকভাবে প্রমাণিত।’ তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, যে সহকারী কমিশনারের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছিল তিনি এখন অন্য একটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগনামা গঠন হয়েছে। বিষয়টি বিভাগীয় বিচারের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ থেকে উত্তরণে ছয় দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে। পাশাপাশি প্রতিটি ভূমি অফিসে সাইনবোর্ডে লিখে দিতে বলা হয়েছে, ‘এই অফিসে কোনো কাজে ঘুষ দিবেন না।’

সরকারের বড় বড় প্রকল্পেও নানা অনিয়ম হচ্ছে। ব্যবহৃত হচ্ছে দুর্বল উপকরণ। গত ১৯ সেপ্টেম্বরের বিভাগীয় কমিশনারদের সভায় বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারকে জানানো হয়, পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার চরলক্ষ্মী গুচ্ছ গ্রামের ঘরগুলোর কোনোটিতেই বন্ধু চুলাসহ রান্নাঘর দেখা যায়নি। বাথরুমগুলোতে নির্ধারিত মানের টিন ও লোহার অ্যাঙ্গেল ব্যবহার না করায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কিছু ঘরের মেঝেতে মাটি দেওয়া হয়নি। স্থানীয় কর্মকর্তারা প্রকল্প কাজের মান নিশ্চিত করেননি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয় বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারকে।

সরকারি বিভিন্ন দপ্তর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর চাকরি প্রার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ঘুষ যতই লাগুক, চাকরি তাঁদের চাই। এ ক্ষেত্রে অর্থ নিয়ে মূলত মৌখিক পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, শিক্ষক, পুলিশ ও প্রাইমারি স্কুলের দপ্তরি নিয়োগ নিয়ে সারা দেশে নানা অনিয়ম হয়েছে। যার তদবির এবং টাকার জোর বেশি তিনিই চাকরি পেয়েছেন। টাকার জোর থাকলে জেলা কোটাও কোনো সমস্যা না। ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে চাকরি দেওয়া হয়েছে। কিছুুদিন আগে কালের কণ্ঠ’র এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, পুলিশের একজন পরিদর্শক ভুয়া ঠিকানা দিয়ে চাকরি নিয়ে কর্মজীবনের শেষ ধাপে চলে এসেছেন, গাজীপুরে তাঁর কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এ নিয়োগ বাণিজ্যে সরকারি চাকরিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা সবাই জড়াচ্ছেন। একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি সংশ্লিষ্টদের বলে দিয়েছি লিখিত পরীক্ষায় যেন অনিয়ম না হয়। যাঁরা লিখিত পরীক্ষায় পাস করবেন তাঁরা যদি স্থানীয় এমপির চিঠি (আধাসরকারি পত্র বা ডিও) নিয়ে আসতে পারেন তাহলে তাঁদের চাকরি দেওয়া হবে। আমি মনে করি, লিখিত পরীক্ষায় যাঁরা পাস করেন তাঁদের চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা আছে।’

লোকাল রেভিনিউ বা এলআর ফান্ডের নামে চাঁদাবাজি ব্যবসায়ীদের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, রাজস্ব থেকেও সরকারকে বঞ্চিত করছে। হোটেল-রেস্তোরাঁর নিবন্ধন বাড়াতে চাঁদা ছাড়াই নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে এলআর ফান্ডে চাঁদা দেওয়া ছাড়া রেস্তোরাঁ নিবন্ধন বা নবায়ন সম্ভব হয় হয় না। গত ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি ঢাকা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে এলআর ফান্ডে চাঁদা না দিয়ে রেস্তোরাঁ নিবন্ধনের সুযোগ দাবি করে। সমিতির মহাসচিব এম রেজাউর করিম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা। অথচ এলআর ফান্ডে দিতে হয় সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত। এই চাঁদাবাজির কারণে অনেকেই রেস্তোরাঁ নিবন্ধন করেন না। এতে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’

দুর্নীতি বিচারালয়েও ছড়িয়েছে। আসামি ও স্বার্থান্বেষীদের কারসাজিতে জাল আদেশ তৈরি হচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারদের দুর্নীতির কারণে বাঁধ ভেঙে হাওরাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় দুদক ১৩ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করেছে। সময়মতো বাঁধ নির্মাণ না করায় দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলে দুদক মনে করে।

সরকারি কক্ষে বসে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঘুষের পরিমাণ নিয়ে দরকষাকষি করেন সরকারি কর্মকর্তারা। আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ ইস্যুকে পুঁজি করে এই দপ্তরের কর্মকর্তারা ঘুষ নেন। বিআরটিএ ও খাদ্য অধিদপ্তরে ঘুষ ছাড়া ফাইল চলে না। টাকা ছাড়া কাজ হয় না পুলিশেও। বিভিন্ন মামলার ফাঁদে ফেলে ঘুষ আদায় করা হয়। যে মামলার আসামি বেশি সেই মামলায় ঘুষের কারবারও বেশি।

প্রজাতন্ত্রে কর্মরতের দুর্নীতি বড় শহরেই সীমিত নেই। বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দুই অফিস সহকারী ও এক উচ্চমান সহকারীর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে। এই চক্রটি শত শত অসহায় মানুষকে ভূমিহীন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হলেও তারা তদবির করে জেলা প্রশাসনে ফিরে যায়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব কবির হোসেন সরদার বিদেশি মুদ্রার পুঁজিবাজার ফরেক্সে দ্রুত লাভের প্রলোভন দিয়ে কাফরুলের মোস্তফা কামালের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নেন। একসময় পাওনা টাকা চাইতে গেলে সহকারী সচিব জীবননাশের হুমকি দেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেন। এসব অসদাচরণের জন্য কবির হোসেন সরকারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ৭ আগস্ট শুধু তিরস্কারের লঘুদণ্ড দেয়।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়। এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘বেতন বৃদ্ধির পর দুর্নীতি কমেছে। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে হাহাকার ভাবটা আর নেই। এ ছাড়া দুর্নীতি কমানোর জন্য সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি কেনাকাটা আইন পরিবর্তন করেছে। ম্যানুয়েল টেন্ডার ছেড়ে ই-টেন্ডারে প্রবেশ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর করেছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন করছে। সব কিছু মিলে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এর পরও কিছু ঘটনা ঘটে—যেগুলো বিচ্ছিন্ন।’ সূত্র: কালের কণ্ঠ