জাতীয়

এমসিকিউ বাতিল কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রশ্ন ছাপানোর চিন্তা

By Daily Satkhira

February 16, 2018

অনলাইন ডেস্ক: প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার লক্ষ্যে বিকল্প দুটি উপায় নিয়ে ভাবছেন হাইকোর্ট গঠিত প্রশাসনিক কমিটির একাধিক সদস্য। এর মধ্যে একটি হলো পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রশ্ন ছাপানো যায় কি না তার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা। অথবা এখন যে পদ্ধতি আছে সেটিকে উন্নত করার উপায় বের করা। দ্বিতীয়টি হলো বহু নির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) বাতিল করা।

ওই কমিটির প্রধানসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান পদ্ধতিতে কোনোভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। তবে কমিটির বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা হাতে পাওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা কাজ শুরু করবেন বলে জানা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

জানা যায়, এবার এসএসসি পরীক্ষার প্রতিটি বিষয়েই প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিতে গত ৪ ফেব্রুয়ারি পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীরকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র বিক্রেতা চক্রের ১৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এত কিছুর পরও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা যায়নি।

এ অবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি আর সমাধান খুঁজতে একটি প্রশাসনিক কমিটি করে দিয়েছেন গতকাল হাইকোর্ট। প্রশাসনিক কমিটির প্রধান করা হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদকে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ গত রাতে বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আমরা সবাই বিব্রত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে নানা ধরনের কাজ করছে। আমরাও চিন্তাভাবনা করছি। তবে কোর্ট যেহেতু কমিটি করে দিয়েছে তাই আমাদের কাজ করতে আরো সুবিধা হবে। তবে এই কমিটিই নয়, অন্য কেউও যদি ভালো সমাধান দিতে পারে, আমরা সেটাও গ্রহণ করব। কমিটি গঠনের চিঠি হাতে পাওয়ার পর আমরা আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করব।’

বিকল্প ভাবনার বিষয়ে বুয়েটের এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমাদের কিছু অল্টারনেটিভ অপশন রয়েছে। প্রথমত কেন্দ্রে কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্ন ছাপানো যায় কি না সেটা দেখতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও উচ্চমানের প্রিন্টার থাকতে হবে। এ ছাড়া এখন যে পদ্ধতি আছে সেটাকেও উন্নত করা যায় কি না সেটাও ভাবা যেতে পারে। এখন যে খাম বা বাক্স দেওয়া হয় সেটাকে উন্নত করে সিকিউরিটি সিল দেওয়া যেতে পারে। এতে সময়ের আগে কেউ প্রশ্নের খাম খুললে তা বোঝা যাবে। আসলে শাস্তি দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা এমন একটা পদ্ধতি বের করতে চাই যাতে এই দুষ্কর্ম কেউ করতে না পারে।’

প্রশাসনিক কমিটির আরেক সদস্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস একটি জাতীয় সমস্যা। এটাকে জাতীয়ভাবে সমাধান করতে হবে। কোর্ট যে কমিটি করেছে তাদের সকলের পক্ষে একটি সুষ্ঠু সমাধান বের করা সম্ভব। আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা করব।’

এ ছাড়া এখন যেহেতু শুধু এমসিকিউ অংশের প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, তাই এমসিকিউ তুলে দেওয়া যায় কি না তা ভাবছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী এ নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষাবিদদের মতামত নেওয়ার কথা বলেছেন। আর কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী জাতীয় সংসদে বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁস রোধ করতে এমসিকিউ তুলে দেওয়া হবে।

এদিকে হাইকোর্ট থেকে দুই কমিটি গঠনের পর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বর্তমান পদ্ধতিতে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। সবার মতামত নিয়ে নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করার চেষ্টা চলছে।

সোহরাব হোসাইন আরো বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব নয়। আমাদের নতুন এমন কোনো প্রক্রিয়া, এমন কোনো পদ্ধতিতে যেতে হবে, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুযোগ থাকবে না। আমাদের যে গুণী ব্যক্তিরা আছেন, তাঁদের নিয়ে বসে যদি নতুন কোনো পথ উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়, তাহলে পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব। এ জন্য সকলে মিলে এগিয়ে আসতে হবে।’ তিনি বলেন, পরিকল্পনা থাকলেও সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় প্রশ্ন না ছাপিয়ে সকাল ১০টায় সব কেন্দ্রের স্ক্রিনে একযোগে সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তবে সেটা করতে পারলে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ থাকবে না।

সচিব বলেন, ‘আমি বারবার বলছি যে বাস্তবতা হচ্ছে, এখানে ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী সংশ্লিষ্ট। ৩০ হাজারের মধ্যে আমি মনে করি যে একেবারে সবাই অনেস্ট ও সিনসিয়ার। কিন্তু দুই-চারজনও যদি এই জঘন্য অপকর্মটি করেন, তাহলে প্রত্যেকের সততা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে; সততার কোনো মূল্য থাকছে না আর।’ কোর্টের কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আদালত যে আদেশ দেবে আমরা অবশ্যই পরিপূর্ণভাবে প্রতিপালন করব। আমাদের কোনো নিষ্ক্রিয়তা থাকলে সেই বিষয়ে আমাদের বক্তব্য অবশ্যই আদালতের কাছে উপস্থাপন করব।’

গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে তথ্য ও প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারও বলেন, প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে পরীক্ষার্থীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত বহু মানুষের সম্পৃক্ততা থাকায় এই পদ্ধতির পরিবর্তন ছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ সম্ভব নয়।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় ২০১৪ সালে ঢাকা বোর্ডের এইচএসসির ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। ওই ঘটনা তদন্তে তখনকার অতিরিক্ত সচিব সোহরাব হোসাইনের নেতৃত্বে গঠিত আন্ত মন্ত্রণালয় কমিটি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। ওই সুপারিশে ছিল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সংশোধন ও প্রশ্ন নির্বাচনের কাজ একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে করতে হবে। ওই সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র প্রণয়নকারীদের কাছ থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে তা প্রশ্নভাণ্ডারে রাখা হবে। সেখান থেকে প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি হবে। একাধিক প্রশ্নপত্রের সেট অনলাইনে পরীক্ষার দিন সকালে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হবে। এরপর স্থানীয়ভাবে প্রিন্টারে ছাপিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। কিন্তু ২০১৪ সালের সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। নেওয়া হয়নি নতুন কোনো কার্যকর উদ্যোগ।

প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময় আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলে থাকে। কিন্তু প্রতিবছর এসএসসিতে ১৭ লাখ, এইচএসসিতে ১২ লাখ, জেএসসিতে ২০ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। শুধু এসএসসি ও এইচএসসিতেই পরীক্ষার ফি বাবদ বোর্ডগুলো প্রায় ৪০০ কোটি টাকা আদায় করে। বোর্ডগুলোর নিজস্ব আয় অনেক বেশি হওয়ায় সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরে নিজস্ব তহবিল থেকেই অতিরিক্ত ছয়টি উৎসব ভাতা নেন। অন্যান্য খাতেও বিপুল টাকা ব্যয় করা হয়। অথচ পরীক্ষা পদ্ধতি উন্নয়নের বিষয়ে তাঁদের তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই।

এদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টের নির্দেশনার আগেই এসএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে কাজ করে যে দল, তারা এরই মধ্যে বেশ কিছু ফেসবুক পেজ এবং মেসেঞ্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ শনাক্ত করেছে। বেশ কয়েকজন প্রশ্নপত্র ক্রেতাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সিআইডির ওই টিমের প্রধান, বিশেষ সুপার (এসএস) মোল্লাহ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এসএসসির প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আমরা এরই মধ্যে কাজ করছি। মহামান্য আদালতের কমিটির পর আমাদের ডিআইজি স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করব।’