জাতীয়

ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন; বিপুল মূলধন ঘাটতির শঙ্কায় সোনালী ব্যাংক

By daily satkhira

September 17, 2018

দেশের খবর: ২০২০ সালের জানুয়ারির মধ্যে ব্যাসেল-৩ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। তখন ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে হবে সাড়ে ১২ শতাংশ। এ পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করতে হলে বিপুল পরিমাণ মূলধন ঘাটতির সম্মুখীন হবে সোনালী ব্যাংক। তাই মূলধন ঘাটতি এড়াতে সরকারের কাছে ৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি চায় রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকটি। একইসঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় প্রদত্ত সেবাসহ সরকারের অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে যৌক্তিক হারে সেবার মাশুল (ফি) নির্ধারণ করতে চায় ব্যাংকটি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের সিইও এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে একটি চিঠিতে ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি জানিয়ে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নে মূলধন ঘাতটি পুরনে ব্যাংক গ্যারান্টিসহ বেশ কিছু পলিসিগত সুবিধা চেয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং এ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নিবিড় তদারকিসহ যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সোনালী ব্যাংক ২০১৭ সালে সত্যিকার অর্থেই ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে এ ব্যাংক দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ২য় সর্বোচ্চ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পরিচালন মুনাফা (১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা) এবং সর্বোচ্চ নিট মুনাফা তথা ৭০৯ কোটি টাকা অর্জন করেছে। গত ২০০৭ সালে সোনালী ব্যাংক করপোরেটাইজকালীন একুমুলেটেড লস ৬ হাজার ৫৭৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা ইনটেনজিবল অ্যাসেট (গুডউইল) এ স্থানান্তর করে ১০ বছরের মুনাফার বিপরীতে সমন্বয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি বছর এ ব্যাংক এক দশমাংশ অর্থাৎ ৬৫৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা করে বিগত ১০ বছরে গুডউইল বাবদ ৬ হাজার ৫৭৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা সম্পূর্ণ সমন্বয় করা হয়েছে। তাছাড়া ২০১৫ সাল থেকে বাস্তবায়নাধীন ব্যাসেল-৩ এর কঠোর নিয়ামানুবর্তিতার কারণে ব্যাংক ক্রমাগত মূলধন ঘাটতির সম্মখীন হচ্ছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিবিড় তদারকি এবং শাখা পর্যায়ে গৃহীত কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে ব্যাংকটি ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পরিচালনা মুনাফার পরিমাণ (সাময়িক) ৯১২ কোটি টাকা অর্জন করে। যেখানে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল মাত্র ৩১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মুনাফা বৃদ্ধির হার ১৮৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। আশা করা যাচ্ছে, আগামীতেও মুনাফা বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকবে। তবে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার কারণে নিট মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নেয়া হলে ২০১৯ সালে ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হিসাবে এ ব্যাংক বিপুল পরিমাণ মূলধন ঘাটতির সম্মুখীন হবে।

সোনালী ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, এ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকার যদি নগদ অর্থের পরিবর্তে ৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি দেয় তাহলে কোনো নগদ লেনদেন ছাড়াই শুধু ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যুর মাধ্যমে এ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে। তাই সোনালী ব্যাংকের বিরাজমান মূলধন ঘাটতি পূরণে ৬ হাজার কোটি টাকার সরকারি গ্যারান্টি ইস্যুর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করা হলো।

চিঠিতে বলা হয়, সোনালী ব্যাংককে নিজস্ব মুনাফার কথা বিবেচনার বাইরে রেখে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সবসময় কাজ করতে হয়। যা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গিপূর্ণ নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে পরিমিত (স্ট্যান্ডার্ড) কমিশন হচ্ছে দশমিক ৪০ শতাংশ। সে হিসাবে সোনালী ব্যাংক সরকারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে ৯৪ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার ঋণপত্রের ক্ষেত্রে মেয়াদকালীন প্রাপ্য কমিশনের পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অথচ সরকার এ ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংককে থোক বরাদ্দ হিসেবে দুই দফায় ২০ কোটি দেয়ার প্রস্তাব করেছে।

ফলে ব্যাংক স্টান্ডার্ড রেট বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার কমিশন থেকে বঞ্চিত হয়েছে সোনালী ব্যাংক। পরবর্তীতে সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড হারে কমিশন প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়।

সোনালী ব্যাংক সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন পর্যায়ের সুবিধাভোগীকে বিনামূল্যে ৩৭টি সেবা এবং নামমাত্র মূল্যে সরকারি কর্মচারীদের ১৪টি সেবা দিয়ে থাকে। এসব সেবার ক্ষেত্রে ব্যাংককে বিপুল পরিমাণ ব্যয়ভার বহন করতে হয়। সরকারের পক্ষে আর্মি পেনশন, সিভিল পেনশন, সঞ্চয়পত্র ও ওয়েজ আর্নার্স বন্ডসমূহ সোনালী ব্যাংক তার নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করে সেবা দিয়ে থাকে। সেবামূল পরিশোধের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পুনঃভরণ দাবির নিরীক্ষাসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে পুনঃভরণ পেতে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়। ফলে এ সব খাতে ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ অনুপার্জিত অবস্থায় বিনিয়োজিত থাকে।

এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় স্বার্থে এবং সরকারি সিদ্বান্তে অনেক অলাভজনক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বিপিসি, বিজেএমসি, বিএডিসি ইত্যাদির সংস্থার সঙ্কটে ১৪ শতাংশ হার সুদে ঋণ দেয়া হলেও পরে সরকারি সিদ্ধান্তে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদে বন্ড নেয়ার মাধ্যমে ঋণ সমন্বয় করা হয়। ফলে এ সব ক্ষেত্রে ব্যাংকের বছরে এক হাজার ৫৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়

তাই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় প্রদত্ত সেবাসহ সরকারের অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে যৌক্তিক হারে সেবার মাশুল (ফি) নির্ধারণ করার আবেদন জানান ব্যাংকটির সিইও এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. ওবায়েদ উল্লঅহ আল মাসুদ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনিয়ম দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী খেলাপির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে মূলধন ঘাটতি বাড়ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর এ হার বেশি।

তিনি বলেন, প্রতিবছরই বাজেট থেকে এ মূলধন যোগান দেয়। অর্থাৎ অনিয়ম-দুর্নীতি ফলে ঘাটতি হওয়া এ মূলধন পূরণে হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। মূলধন সরবরাহের সরকারি উদ্যোগের কোনো যুক্তিযুক্ত নেই। এ উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার সামিল।

ব্যাংক গ্যারান্টির বিষয়ে সাবেক এ গভর্নর বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারকে নগদ টাকা দিতে না হলেও পুরো টাকার দায়ভার কিন্তু সরকারকেই নেতে হবে। তাই বিষয়টি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তবে সরকারি কাজে ফি নির্ধারণে বিষয়ে সরকার ভেবে দেখতে পারেন বলেও মত দেন তিনি।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে বলেন, সোনালী ব্যাংকের চিঠিতি নথিভুক্ত করা হয়েছে। আর বেশি কিছু তিনি বলতে চাননি।