ফিচার

এরশাদ ফের সিএমএইচে, জটিল অবস্থা জাপায়

By Daily Satkhira

December 05, 2018

রাজনীতির খবর: জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আবারও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে। গত সোমবার রাত ২টার দিকে তাকে বারিধারার বাসভবন থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে দলের নবনিযুক্ত মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ দাবি করেছেন, এরশাদ শতভাগ ভালো আছেন। বাসায় ভয় ও একাকিত্বের কারণে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

এ অবস্থায় জাপার পক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটের আসন বণ্টনে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন কে, তা স্পষ্ট নয়। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, জাপার তিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ নয় নেতা দরকষাকষির দায়িত্ব পেয়েছেন। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন। দলের মহাসচিব বদল হলো। চেয়ারম্যান আবার হাসপাতালে। এদিকে, আসন বণ্টনের হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে জটিল অবস্থা বিরাজ করছে জাপায়।

জাপার পক্ষে দরকষাকষি করা নেতাদের একজন নিশ্চিত করেছেন, আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ৩৩ থেকে ৩৪টির বেশি আসনে মহাজোটের মনোনয়নের আশ্বাস পায়নি জাতীয় পার্টি। জাপার ৮ থেকে ১০ জন বর্তমান এমপির বাদ পড়া অনেকটা নিশ্চিত। সদ্য সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারসহ দলের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার মনোনয়ন অনিশ্চিত। ৩৬ আসন দখলে থাকা জাতীয় পার্টির জন্য ২৪টি আসন ফাঁকা রেখে সেখানে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। কিন্তু এসব আসনের বেশ কয়েকটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। এ কারণে আসন হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন জাপার প্রার্থীরা।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ বলেন, জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ৫৪ থেকে ৫৫টি আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করছেন। আসন বণ্টনে আলোচনা চলছে। তবে কতজন প্রার্থী মনোনয়ন পাবেন, তা ৯ ডিসেম্বর জানা যাবে। সেদিন মহাজোটের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরশাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও মসিউর রহমান বলেছেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানই আসন বণ্টনের আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

গত সোমবার মহাসচিব হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান জানিয়েছিলেন, দু-একদিনের মধ্যে এরশাদকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়া হতে পারে। তবে গতকাল বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখবেন। দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব শেষ না করে তিনি দেশের বাইরে যেতে চান না।

৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ‘অসুস্থ’ এরশাদকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। এবারও ভোটের আগে ঘন ঘন তার সিএমএইচে ভর্তি হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন রয়েছে। গত এক মাসে সাবেক এই সেনাপ্রধানকে চারবার সিএমএইচে নেওয়া হয়েছে। তবে তাকে শতভাগ ফিট দাবি করে মসিউর রহমান বলেছেন, ঘুমের সমস্যা হলেও চেয়ারম্যান সিএমএইচে যান। অসুস্থ অবস্থায় বাসায় একা থাকতে তার ভয় করে। তাছাড়া ইনফেকশনের ভয়ও আছে। রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার পর শারীরিক অবস্থা নিয়ে এরশাদ ‘ভয়ে থাকেন’; এ কারণেই তাকে ঘন ঘন সিএমএইচে নেওয়া হচ্ছে।

আগের দিন মসিউর রহমান আভাস দিয়েছিলেন, মনোনয়নবাণিজ্যের কারণেই এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার মহাসচিবের পদ হারিয়েছেন। ক্ষণে ক্ষণে মত বদলের কারণে আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিক এরশাদের দলের নবনিযুক্ত মহাসচিবও আগের দিনের অবস্থান থেকে সরে আসেন। তিনি দাবি করেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রুহুল আমিন হাওলাদার পদত্যাগ করেছেন। তাকে মহাসচিব পদ থেকে সরানো হয়নি।

জাপা মহাসচিব তার পূর্বসূরিকে অসুস্থ দাবি করলেও রুহুল আমিন হাওলাদার পটুয়াখালী-১ আসনে তার প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। ঋণখেলাপির কারণে প্রার্থিতা বাতিলের পর মনোনয়নবাণিজ্যের অভিযোগে দলের পদ হারানো এ নেতা এখনও নীরব রয়েছেন। গতকাল দিনভর চেষ্টা করেও তার প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।

২১০ আসনে জাতীয় পার্টির ২৩৩ প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৮ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। ১৮৬ আসনে জাপার ১৯৫ জনের প্রার্থিতা টিকে আছে। সদ্যসাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের স্বাক্ষরে তারা দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। যারা শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকবেন, তারা কার স্বাক্ষরে দলীয় প্রতীক বরাদ্দ পাবেন তা এখনও পরিস্কার নয়। এ নিয়েও দ্বিধায় রয়েছেন জাপার প্রার্থীরা।

কে মহাজোটের মনোনয়ন পাচ্ছেন, কে পাচ্ছেন না- এ দ্বিধাতেও রয়েছেন জাপার অধিকাংশ প্রার্থী। দলটির সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের কাছে তারা ৪৭টি আসন চেয়েছিল। এর মধ্যে চারজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ জাপার জন্য ফাঁকা রেখেছে ২৪ আসন। বাকি আসনগুলোর কয়টি শেষ পর্যন্ত জাপা পাবে, তা নিশ্চিত নয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের দৃষ্টিতে জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী থাকলে তবেই আসন ছাড়া হবে। এর বাইরে জাপা যদি কাউকে জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী মনে করে তবে আসন উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সেখানে আওয়ামী লীগেরও প্রার্থী থাকবে।

জাপার পক্ষে দরকষাকষিতে থাকা সুনীল শুভরায় খুলনা-১ আসনে প্রার্থী। ওই আসনে আওয়ামী লীগ আটবার জয়ী হয়েছে। নব্বই-পরবর্তী নির্বাচনে জাপা এ আসনে কখনই আট হাজারের বেশি ভোট পায়নি। এরশাদের প্রেস সচিব সুনীল শুভরায়কে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, এ আসন ছাড়া সম্ভব নয়। প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি দুই দলেরই প্রার্থী থাকবে।

কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এ আসন উন্মুক্ত রেখে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামতে চায় না জাতীয় পার্টি। নবম সংসদ নির্বাচনে ৪৯ আসনে জাপার প্রার্থী ছিল। এর মধ্যে ২৯টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিল না। বাকি ২০টি আসন ছিল উন্মুক্ত। জাপার সঙ্গে জোট হলেও এসব আসনে আওয়ামী লীগেরও প্রার্থী ছিল না। এ আসনগুলোর একটিতেও জয়ী হতে পারেনি জাতীয় পার্টি। জামানত হারায় ১৪টিতে।

বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও একই অভিজ্ঞতা হয় জাপার। এরশাদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও ৮৬ আসনে প্রার্থী ছিল দলটির। ২১ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা জাপাকে ৪৮টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু জাপা জিতে ৩৩ আসনে। বাকি ১৫ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের সঙ্গে হারে লাঙলের প্রার্থী।

জাপার নির্বাচন সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা একজন নেতা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে ত্রিমুখী লড়াইয়ে কোনো আসনেই তাদের এককভাবে জেতার অবস্থা নেই। তাই উন্মুক্ত আসনে কেউ প্রার্থী হতে চান না। যারা নির্বাচন করতে চান, তাদের সবাই মহাজোটের মনোনয়ন চান। এ কারণেই এবার জাপায় মনোনয়নবাণিজ্য হয়েছে। এতে এরশাদ এবং রুহুল আমিন হাওলাদারের নাম জড়িয়েছে। মসিউর রহমান গতকাল বলেন, মনোনয়নবাণিজ্যে কারও নাম এলে শাস্তি দেওয়া হবে। কেউ দলের সিদ্ধান্ত না মেনে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাকেও শাস্তি পেতে হবে।