ফিচার

চলে গেলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান সাইদুল আনাম টুটুল

By Daily Satkhira

December 19, 2018

নিজস্ব প্রতিবেদক: অভিনয়শিল্পী এবং ছোট ও বড় পর্দার বরেণ্য নির্মাতা ও চিত্র সম্পাদক সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান সাইদুল আনাম টুটুল আর নেই। তিনি মঙ্গলবার বেলা ৩টা ১০ মিনিটে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। এ সময় পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী মোবাশ্বেরা খানম। সাইদুল আনাম টুটুলের বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। হাসপাতাল থেকে সাইদুল আনাম টুটুলের ভাতিজা সামিউল আনাম এই মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি হাসপাতালের কাস্টমার কেয়ার থেকেও তা নিশ্চিত করা হয়েছে।উল্লেখ্য, সাইদুল আনাম টুটুল এর গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের রসুলপুর। তার মৃত্যুর সংবাদে সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায় নেমে এসেছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাঁর দুই মেয়ে ঐশী আনাম ও অমৃতা আনাম এখন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। সোমবার বড় মেয়ে ঐশী আনাম দেশে ফিরেছেন। বুধবার ছোট মেয়ে অমৃতা আনাম দেশে ফেরার পর সাইদুল আনাম টুটুলকে দাফন করা হবে।

গত শনিবার রাতে তিনি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁকে ল্যাবএইড হাসপাতালে আনা হয়। চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি করেন। এরপর তাঁকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি অনুদানে ‘কালবেলা’ ছবিটি পরিচালনা করছিলেন সাইদুল আনাম টুটুল। আইন ও সালিশ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘নারীর ৭১ ও যুদ্ধপরবর্তী কথ্য কাহিনি’ বই থেকে ‘কালবেলা’ ছবির গল্প নেওয়া হয়েছে। ছবিটি প্রযোজনা করছে সাইদুল আনাম টুটুলের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আকার’। এর আগে সরকারি অনুদানে নির্মিত সাইদুল আনাম টুটুলের প্রথম ছবি ‘আধিয়ার’ মুক্তি পায় ২০০৩ সালে। ১৯৭৯ সালে ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রে কাজ করে শ্রেষ্ঠ চিত্র সম্পাদক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।সাইদুল আনাম টুটুল ডিরেক্টরস গিল্ডের প্রথম সাধারণ সম্পাদক ও আজীবন সদস্য। ‘ঘুড্ডি’, ‘দহন’, ‘দীপু নাম্বার টু’ ও ‘দুখাই’য়ের মতো সিনেমার সঙ্গে রয়েছে তাঁর সংশ্লিষ্টতা। এই ছবিগুলোর সম্পাদনা করেছেন তিনি

সাইদুল আনাম টুটুল ১৯৫০ সালের ১ এপ্রিল পুরোনো ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব-কৈশোর থেকেই তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তিনি ঢাকা সরকারি মুসলিম স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক এবং পরে ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৭১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে সাইদুল আনাম টুটুল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং ৬ নম্বর সেক্টরের আওতায় খুলনা অঞ্চলে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইদুল আনাম টুটুল ব্যবসায় বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তিনি ১৯৭৪ সালে ভারতের আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে ভারতের পুনায় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে চলচ্চিত্র সম্পাদনার ওপর অধ্যয়ন করতে চলে যান। চলচ্চিত্র সম্পাদনার ওপর পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

বাংলাদেশে ফিরে সাইদুল আনাম টুটুল ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রের সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ ছবির জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র সম্পাদকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয় এই ছবিটি।

চলচ্চিত্র সম্পাদক হিসেবে তিনি ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’ ছাড়াও সম্পাদনা করেন সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী নির্মিত ‘ঘুড্ডি’, শেখ নিয়ামত আলী নির্মিত ‘দহন’, মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’, ‘দুখাই’ ও ‘দীপু নাম্বার টু’। চলচ্চিত্র সম্পাদনার দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি ছিলেন একজন গুণী চলচ্চিত্র শিক্ষক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংসদের আয়োজনে ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স ও চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি চলচ্চিত্র ভাষা ও চলচ্চিত্র সম্পাদনা বিষয়ে পাঠদান করতেন।

চলচ্চিত্রকার সাইদুল আনাম টুটুল ২০০৩ সালে নির্মাণ করেন তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘আধিয়ার’। ১৯৪৬-৪৭ সালের বাংলার চাষিদের তেভাগা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘আধিয়ার’ সমালোচক ও দর্শকের কাছে একটি সুনির্মিত চলচ্চিত্র হিসেবে নন্দিত হয়।

সাইদুল আনাম টুটুল বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের একজন কিংবদন্তি নির্মাতা। বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন নাটকের নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুল। তাঁর উল্লেখযোগ্য টেলিভিশন নাটকগুলো হলো ‘নাল পিরান’, ‘বখাটে’, ‘সেকু সেকান্দর’, ‘৫২ গলির এক গলি’, ‘আপন পর’, ‘গোবর চোর’, ‘হেলিকপ্টার’, ‘নিশিকাব্য’, ‘অপরাজিতা’ ইত্যাদি।

এ ছাড়া সাইদুল আনাম টুটুল বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের ধারায় প্রভূত পরিবর্তন আনেন। একজন সফল বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা হিসেবে তিনি চার শতাধিক বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছেন।

তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চলচ্চিত্র অনুদানে সাইদুল আনাম টুটুল ‘কালবেলা’ নামে তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ করছিলেন। চলচ্চিত্রটির দৃশ্যধারণের প্রায় ৯০ ভাগ কাজ তিনি শেষ করেন। চলচ্চিত্রটির বাকি অংশের শুটিংয়ের জন্য তিনি শিগগিরই রাজশাহীতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এ অবস্থায় ১৫ ডিসেম্বর তিনি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানী ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি হন।