নিয়ন্ত্রণহীন ইজিবাইক; প্রতি মাসে ৯০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি!

দেশের খবর: মোটরযান আইন অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক বৈধ নয়- রাস্তায় চলাচলের বৈধতা নেই এ যানবাহনের। এটি যান্ত্রিক না অযান্ত্রিক যানবাহন তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। তবে পুরোদস্তুর যান্ত্রিক যানবাহন হিসেবে সারাদেশে বর্তমানে চলাচল করছে প্রায় ১৫ লাখ ইজিবাইক, যার মধ্যে প্রায় দুই লাখই চলছে রাজধানী ও এর আশপাশে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ যানকে ঘিরে জীবিকার সংস্থান হচ্ছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের।

মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে অপরিহার্য হয়ে ওঠা ইজিবাইক আইনত ‘অবৈধ’ হওয়ায় একে ঘিরে বিস্তৃত অর্থনৈতিক কার্যক্রমও হিসাব-নিকাশের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ইজিবাইক চালনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে অবৈধ লেনদেন। ইজিবাইকের দুর্ঘটনাগুলোরও কোনো রেকর্ড থাকছে না। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, অপরিহার্য হয়ে ওঠায় ইজিবাইককে বরং আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা উচিত। তাতে এই যানকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তেমনি এর অর্থনৈতিক পরিধি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

৯০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি :

ইজিবাইক বর্তমানে রাস্তায় চাঁদাবাজির অন্যতম উৎস। প্রতিটি ইজিবাইক থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। এই চাঁদা নেওয়া হয় ‘জিপি’ নামে। গড়ে ২০ টাকা করে ১৫ লাখ ইজিবাইক থেকে মাসে চাঁদাবাজির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৯০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে পুলিশ- সবাই এই চাঁদাবাজির সুবিধাভোগী।

আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন না দেওয়ার কারণে নম্বরবিহীন এসব যানবাহন রাস্তায় চলছে বিশৃঙ্খলভাবে। চালাচ্ছে লাইসেন্স-প্রশিক্ষণহীন চালক। রাজধানীসহ দেশের এমন কোনো জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও গ্রাম নেই- যেখানে ইজিবাইক চলে না। প্রায় সবখানেই ইজিবাইক চলছে মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তত্ত্বাবধানে। এগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন শত শত মানুষ।

এ প্রসঙ্গে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. মো. কামরুল আহসান জানান, ২২টি মহাসড়কে ইজিবাইক চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মোটরযানের সংজ্ঞায় না পড়ায় ইজিবাইকের নিবন্ধন দেওয়াও বিআরটিএর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, মহাসড়কের বাইরে অন্য কোথায় কীভাবে ইজিবাইক চলছে, সেটি দেখার দায়িত্ব বিআরটিএর নয়। স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে।

চলাচল নিষিদ্ধ, যন্ত্রাংশ নয়! :

২০১১ সালের ৫ মে ইজিবাইক চলাচল এবং আমদানি নিষিদ্ধ করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে ওই প্রজ্ঞাপনে ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়নি। এ কারণে ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি অব্যাহত থাকে এবং দেশে এর সংযোজন শিল্প গড়ে ওঠে। সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি ইজিবাইকের চলাচলও অব্যাহত থাকে সড়ক-মহাসড়কে। পাশাপাশি ব্যাটারি সংযোজন করে পায়ে চালানো রিকশাকে পরিণত করা হয় ইলেকট্রিক অটোরিকশায়।

প্রায় বছরখানেক আগে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি নিষিদ্ধ করা হবে কি-না, তা নিয়ে লম্বা বিতর্ক হয়। এ সময় অনেকেই এই যানবাহনকে দুর্ঘটনা এবং সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী করে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণার অভিমত দেন। আবার কমিটির অনেকেই বলেন, প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে ইজিবাইক আমদানি, সংযোজন এবং রাস্তায় চলাচল করতে দিয়ে এখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ঠিক হবে না। এর ফলে এই যানবাহনকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহকারী অসংখ্য মানুষ যেমন বেকার হয়ে পড়বেন, তেমনি এতে চলাচলকারী মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রাও ব্যাহত হবে।

এমন প্রেক্ষাপটে কমিটির সভায় একাধিক সদস্য ইজিবাইক নিয়ে বিতর্ক বন্ধ করে একে নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে সড়কভেদে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দেন। এরপরও ইজিবাইক চলাচল নিয়ে সরকারি কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

চরম ঝুঁকিপূর্ণ, তবু অপরিহার্য :

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর চেয়ে একটু দূরবর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়কের সংযোগ সড়কে ইজিবাইক অবাধে চলাচল করছে। যেমন- উত্তরায় আজমপুর থেকে উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকায়, বিমানবন্দর রেলগেট থেকে দক্ষিণখান ও কসাইবাড়ি মোল্লারটেক পর্যন্ত সড়কে ইজিবাইক চলাচল করে। চলাচল করে খিলক্ষেত বাজার থেকে উত্তরপাড়া, লেকসিটি, ডুমনি, পাতিরা এলাকায়; যাত্রাবাড়ী থেকে জুরাইন এলাকায়। এ ছাড়া খিলগাঁও থেকে বাসাবো এবং প্রগতি সরণি থেকে বাড্ডা এলাকার ভেতরও ইজিবাইক চলাচল করে।

সবখানেই দেখা যায়, তিন চাকার হালকা এই যানবাহনের পেছনে চারজন, চালকের দুই পাশে দু’জন হিসেবে মোট ছয় যাত্রী বহন করা হচ্ছে। উত্তরা এলাকায় খানিকটা বড় আকারের ইজিবাইক দেখা যায়। এটির চাকা তিনটি হলেও আসন সংখ্যা আটটি।

খিলক্ষেত এলাকায় রাকিব নামে এক যাত্রী জানালেন, এটি ঝুঁকিপূর্ণ যান, রাস্তায় চলে রিকশার চেয়েও বিশৃঙ্খলভাবে, চালকদের বেশিরভাগই অপ্রশিক্ষিত, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু কিছুই করার নেই। কারণ, খিলক্ষেত বাজার থেকে লেকসিটি, ডুমনি, পাতিরা পর্যন্ত যেতে একমাত্র বাহনই এই ইজিবাইক। কিছু রিকশা এখনও চলাচল করে। সেগুলোর ভাড়া খুবই বেশি। যেখানে ইজিবাইকে ভাড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা, সেখানে রিকশায় ভাড়া লাগে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। তাই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ইজিবাইকে চড়েন তিনি।

স্থানীয়রা জানান, মাঝেমধ্যে হঠাৎ পুলিশি অভিযানের কারণে ইজিবাইক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষকে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দিয়ে রিকশায় কিংবা রিকশা না পেয়ে তিন-চার কিলোমিটার পথ হেঁটে আসতে হয়। কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর আবারও ইজিবাইক চলাচল শুরু হয়- এভাবেই সবখানে লুকোচুরি খেলা চলে ইজিবাইক নিয়ে।

কে কী ভাবছেন :

ইজিবাইকের ব্যবহার ও বৈধতা প্রসঙ্গে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ইজিবাইক কোনোভাবেই মোটরযানের মানদণ্ডে পড়ে না। দীর্ঘ সময় ধরে এই যান চলছে। সময়ের পরিবর্তনে পায়ে টানা রিকশার জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ইজিবাইক। এখন এর বৈধতা বা অবৈধতা নিয়ে বিতর্ক তোলার চেয়ে বরং এটি কীভাবে নিরাপদে চালানো যায়, সেটিই ভাবা উচিত। ইজিবাইকের গতি মহাসড়কে চলার উপযোগী নয়- তাই কোনোভাবেই একে হাইওয়েতে চলতে দেওয়া উচিত নয়। এটি ছোট ছোট সড়কে চলতে পারে। তা ছাড়া মহাসড়কের পাশে সার্ভিস রোড করা যেতে পারে, যেখানে এরকম কম গতির যানবাহন চলাচল করবে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন চৌধুরী বলেন, ইজিবাইক নিয়ে অদ্ভুত সংকটজনক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। গতির দিক বিবেচনায় এগুলো সড়কে যাত্রীবাহী মোটরযান হিসেবেই চলাচল করে। কিন্তু মোটরযানের আইনি স্বীকৃতি না থাকার কারণে এগুলো কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে পড়ছে না। তিনি বলেন, আমদানিকারকরা ব্যবসা করছে। মালিক-চালকরাও দিব্যি চালাচ্ছে। শুধু বৈধতার সংকটের অজুহাতে সাধারণ যাত্রীদের রাখা হচ্ছে চরম ঝুঁকিতে। সরকার যদি এগুলো রাস্তায় চলতেই দেয়, তা হলে প্রশাসনের উচিত এগুলোকে বিধিনিয়মের মাধ্যমে যথাযথ লাইসেন্স দিয়ে চালানো।সূত্র: সমকাল

Related posts