দেবহাটার পারুলিয়ায় রেপরোয়া হাইব্রিড আ. লীগার নূর আমিন !


নিজস্ব প্রতিবেদক: এক সময়কার চোরাচালানি হাইব্রিড আ. লীগার নূর আমিন এর অত্যাচারে জিম্মি সাধারণ মানুষ! অন্যের জমি, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করতে প্রতিপক্ষের চাঁদাবাজি মামলা ও নাশকতার মামলাসহ ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করানোর টেন্ডার নাকি তার হাতে। খোলস পাল্টে তিনি নব্য আ. লীগার সেজে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
দেবহাটা উপজেলার কয়েকজন জানান, একই গ্রামের সাপামারা খালের পাশের কোরবান আলীর ছেলে নুর আমিন দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে চোরা পথে বিভিন্ন ধরণের পশুপাখি এনে বাজারে বিক্রি করতেন। এরসঙ্গে ছিল তার চোরাকারবারি ব্যবসা। বিএনপি’র রাজনীতিতে জড়িয়ে থেকে দলের অর্থযোগান দিতেন তিনি। তাই ২০০১ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাংসদ কাজী আলীউদ্দিন ও বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক বাবু তার বাড়িতে মাসের বড় একটা সময় কাটাতেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর নুর আমিন ভোল পাল্টে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কতিপয় প্রভাবশালী নেতার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। করছেন তাদের সঙ্গে ব্যবসাও। তবে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে দেশজুড়ে জামাত বিএনপি’র নাশকতা চালানোর ব্যাপারে তিনি ছিলেন সংগঠক ও অর্থ যোগানদাতা। লুটপাট, ভাঙচুর, মারপিট করে অন্যের বাড়ি, জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় হয়রানি, ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশে ২০১৬ সালের ৩০ জুন দেবহাটা উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উত্তর পারুলিয়ার রফিকুল ইসলাম ও তার ভাইয়ের স্ত্রী রহিমা আফরোজার নামীয় বন্দক রাখা ৯৭ শতক জমি সোনালী ব্যাংক পারুলিয়া শাখা থেকে ২০০৮ সালের ৫ আগস্ট ছয় লাখ টাকায় নিলাম কেনেন নুর আমিন গাজী। ওই নিলাম খরিদের বিরুদ্ধে তার(রফিকুল) ছেলে সাহেদ ইকবাল ওই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রিয়েমশান মামলা করে। যা বর্তমানে বিচারাধীন। একই দাগে পার্টিশান বহির্ভূত আরো অন্যদের নামে অনেক জমি থাকায় ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জারিকারক ও পুলিশ নূর আমিনকে জমি বুঝিয়ে দিতে না পেরে ফিরে যান বলে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি দেবহাটা থানার সহকারি উপপরিদর্শক বসির আহম্মেদ আদালতকে অবহিত করেন। একপর্যায়ে নূর আমিন ২০১০ সালে দেওয়ানী আদালতে ৪১/১০ নং পার্টিশান মামলা করেন। একইভাবে ১৯৯০ সালের পর থেকে মানসিক ভারসাম্য হারানো ওহাব আলী মন্ডলের ছেলে শফিকুলের দানপত্র মূল্যে নেওয়া সাড়ে ছয় বিঘা জমি নিয়ে ভাইদের মামলা থাকালেও যথাযথ কাজজপত্র না থাকার পরও বিচারাধীন অবস্থায়(দেঃ ৫০/১৩) কিনে নেন নুর আমিন। কোন আইনি প্রক্রিয়ায় কোন জমির রেকর্ড, নামপত্তন ও খাজনা দিতে না পারায় দখল করতে মরিয়া হয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালান নূর আমিন। এমনকি রফিকুল ইসলামকে দু’টি চাঁদাবাজি ও তিনটি নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার করিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে রফিকুল ও তার শরীকদের জমির পাশে পাকা দেওয়াল তুলে জবর দখলের চেষ্টা করেন নুর আমিন। প্রতিবেদনে রফিকুল ইসলামের অভিযোগ সত্য বলে উল্লেখ করা হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুনের ও একই বছরের ২১ অক্টোবর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাজমুন্নাহার এর পৃথক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে তপন বিশ্বাসের কাছ থেকে চার শতক জমি কেনার পরও সেটা এসএ খতিয়ান দেখিয়ে ডিপি ১৮০০ খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে আবুল হোসেন। পরে হাল দাগ দেখিয়ে নূর হোসেন কৌশলে আবুল হোসেনকে দিয়ে আদালতে মামলা করিয়ে গায়ের জোরে তপন বিশ্বাসের আরো চার শতক জমির উপর নির্মিত ২৫ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ নেওয়া ৬০ লাখ টাকার জমি ও গুদামঘর দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমনকি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী কামালকে ম্যানেজ করে তপন বিশ্বাসের ভাড়াটিয়া মাছ ব্যবসায়ি মাহাবুব বিশ্বাসকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নূর আমিন। ২০১৫ সালে একইভাবে তপন বিশ্বাসের জমির একাংশ দখল করতে তপন বিশ্বাস ও তার ছেলেদের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে আবুল হোসেন তপন বিশ্বাসের প্রায় এক শতক জমি ভবন নির্মাণ করে জবরদখলে রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে উত্তর পারুলিয়ার মোবারক মোল্লার ছেলে মঞ্জুরুল ইসলামের কাছ থেকে ২০১৪ সালে ১০ কাঠা জমি ছয় লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে লিখে নেন নুর আমিন। টাকা চাওয়ায় মঞ্জরুলকে দেবাহাটা ও সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি নাশকতার মামলায় জেলে পাঠানো হয়। এ ছাড়া তপন বিশ্বাসের ছেলে অনুপ বিশ্বাস ও মঞ্জুরুলকে টেকনাফ থানার চাঁদাবাজি ও অপহরনের মামলার ভুয়া ওয়ারেন্টে ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর দেবহাটা পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করান নুর আমিন। ওয়ারেন্ট ভুয়া প্রমানিত হওয়ায় খালাস তারা দু’জন খালাস পায়। বর্তমানে জমির টাকা না পেয়ে ও মামলার খরচ যোগাড় করতে মঞ্জুরুল ভ্যান চালাচ্ছেন। আবারো মামলা দেওয়া হতে পারে এমন আশঙ্কায় নুর আমিনের কাছে টাকা চাওয়ার কথা ভুলে গেছেন তিনি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জানান, একমাত্র জামাতার প্রভাবে পুলিশ নুর আমিনের বিরোধিতা করতে চায় না। তাই নূর আমিনের বিরোধিতা করার লোক পাওয়া যায় না। তবে বিষয়টি গত রোববার জেলা আইন শৃঙ্খলা মাসিক সভায় উপস্থপিত হওয়ায় নতুন মাত্রা পেয়েছে।
জানতে চাইলে নুর আমিন জানান, পুলিশ কাউকে ধরলে তার দায় তিনি নেবেন কেন। তাছাড়া রফিকুল ইসলাম ও তাদের শরীকদের কাছ থেকে কেনা ও নিলাম মূলে যে জমি পেয়েছেন তা নিয়ে মামলা আছে। রয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। তার জামাতা বা প্রশাসনে কর্মরত ও কোন আত্মীয়র নাম ব্যবহার করে তিনি কোন সুবিধা আদায় করেন না। তিনি আবুল হোসেনের কাছ থেকে ১২ বছরের লিজ নিয়েছেন। তপন বিশ্বাসের পক্ষে মাহাবুব বিশ্বাস সেখানে আর ব্যবসা করেন না। দেবহাটা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান মিন্নুরেরর সঙ্গে মঙ্গলবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি রিসিভ করেননি।
পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান জানান, তপন বিশ্বাসের অভিযোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দেবহাটা সার্কেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী ইমরান ছিদ্দিককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Related posts