নতুন বেতন স্কেলে প্রাথমিকের শিক্ষক-কর্মকর্তারা

শিখ্ষা সংবাদ: নতুন গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাবও রয়েছে। ইতোমধ্যে ‘শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা’ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে গ্রেড পরিবর্তনের নির্দেশনা জারি করা হতে পারে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনস্কেল বৈষম্য দূরীকরণের সিদ্ধান্ত নেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কয়েক দফায় শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১২তম গ্রেড ও প্রধান শিক্ষক পদ ১০তম গ্রেড, উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ৯ম গ্রেড ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ৭তম গ্রেডে উন্নীত করা হবে।

জানা গেছে, গত দুই মাস আগে এ প্রস্তাব জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। শিক্ষক-কর্মকর্তারা যোগদানের পরই উল্লিখিত গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত হবেন। তবে যোগদানের পর শিক্ষকরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলে তাদের গ্রেড পরিবর্তন না করে বাড়তি ভাতা দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।

পাশাপাশি বিদ্যালয়ে নতুন পদ হিসেবে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। এ পদ সৃষ্টি হলে সারাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে এটি প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু এতদিন শিক্ষক নিয়োগের সংশোধনী নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় এ কার্যক্রমের তেমন অগ্রগতি হয়নি। গত ৩ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ বিধিমালার অনুমোদন করেন রাষ্ট্রপতি। বর্তমানে এর ভাষাগত সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে বিজি প্রেসে দেয়া হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এটির গেজেট প্রকাশ হবে। তাই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গ্রেড পরিবর্তনের কার্যক্রম চূড়ান্ত করতে আর কোনো বাধা রইল না।

কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, বর্তমানে প্রধান শিক্ষক পদটি দ্বিতীয় শ্রেণির হলেও তারা বেতন পান ১১তম গ্রেডে। অথচ দ্বিতীয় শ্রেণির অন্য সব চাকরিজীবী ১০ম গ্রেডে বেতন পান। এমনকি ৩৪তম বিসিএস থেকে যখন দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয় তখন সবাই ১০ম গ্রেড পেলেও শুধু সরকারি প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা পাচ্ছেন ১১তম গ্রেড। ফলে প্রধান শিক্ষকদের একাধিক সংগঠন ১০ম গ্রেডে বেতনের দাবিতে আন্দোলনে নামেন।

বর্তমানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১৪তম গ্রেডে। ফলে প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের বেতনের পার্থক্য তিন ধাপ। কোনোভাবেই সেটি মেনে নিতে রাজি নন সহকারী শিক্ষকরা। তারা প্রধান শিক্ষকের এক ধাপ নিচে বেতন চান। এ নিয়ে একাধিকবার আন্দোলনও করেছেন সহকারী শিক্ষকরা।

এছাড়া সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ১০ম গ্রেড ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা ৯ম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন। সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা ৯ম গ্রেড ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা পাচ্ছেন ষষ্ঠ গ্রেড। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদ দুটি ষষ্ঠ গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা এবং জেলার প্রধান পদ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার দাবি কর্মকর্তাদের।

উল্লেখ, বর্তমানে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা ৯ম গ্রেডে ১২ থেকে ১৫ বছর দায়িত্ব পালনের পর সহকারী জেলা প্রাথমিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পান। এ ক্ষেত্রে ৭ম গ্রেডে বেতন আহরণ করলেও তাদের ৯ম গ্রেডে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে।

জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন স্কেলের এ পরিবর্তনের কাজে প্রধান শিক্ষকরা খুশি হলেও সহকারী শিক্ষকরা খুশি নন। তারা সহকারী প্রধান শিক্ষকের নতুন পদটি চান না।

তারা মনে করছেন, এ পদ সৃষ্টি হলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি পেতে সহকারী শিক্ষকদের দুটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। আর সহকারী প্রধান শিক্ষক পদটি না থাকলে এক ধাপ পদোন্নতি পেলেই প্রধান শিক্ষক হওয়া যাবে। তারা প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপেই বেতন চান।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, আমাদের দাবি প্রধান শিক্ষকের পরের গ্রেড। কিন্তু সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টি হলে আমরা যখন ওই পদে পদোন্নতি পাব, তখন এমনিতেই আমরা ওই পদের স্কেলে বেতন পাব। তাহলে সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য থেকেই যাবে। তাই আমরা এ মুহূর্তে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ চাই না। আমরা প্রধান শিক্ষকের পরের গ্রেডে বেতন চাই। তবে, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গ্রেড পরিবর্তনের কার্যক্রমকে তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নতুন গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করতে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেড, প্রধান শিক্ষকদের ১০তম গ্রেড, সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ৯তম গ্রেড ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের ৭ম গ্রেডে উন্নীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

‘এরই ধারাবাহিকতায় সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পদেও বর্তমান গ্রেড পরিবর্তন আনা হবে। তবে এ দুই বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। নতুন পদ হিসেবে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টি করার প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে’,- যোগ করেন তিনি।

অতিরিক্ত সচিব বলেন, একটি স্তরে গ্রেড পরিবর্তন করতে হলে আগে-পরে অন্য পদগুলোরও গ্রেড পরিবর্তন করতে হয়। এটি একটি চেইন সিস্টেম, সেই অনুযায়ী প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সংশোধিত নীতিমালার অনুমোদন দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তাই আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদ সৃষ্টি নিয়ে শিক্ষকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে উল্লেখ করে গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, যেহেতু এ বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, তাই পদ সৃজনের কার্যক্রম চূড়ান্ত করার আগে শিক্ষকদের সঙ্গে আবারও আলোচনা করা হবে। যদি তারা আপত্তি জানান তবে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

Related posts