অনলাইন ডেস্ক : শ্রীমঙ্গল বাংলাদেশের একটি চা বাগান সমৃদ্ধ অঞ্চল, যা ঢাকা থেকে ১৮৩ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এটি তার অন্তহীন সৌন্দর্য এবং সবুজের জন্য পরিচিত।
সেই সবুজের মাঝে গত কয়েক বছর ধরে ‘মিনি হাজরা’ নামে এক নারী চা বাগানে পাতা তোলার কাজ করছেন। রোদ, বৃষ্টি আর ঝড় উপেক্ষা করে তারা এই বাগানে কাজ করেন এই আশায় যে—একদিন তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।
মিনি হাজরা তার কর্মস্থলে দাঁড়িয়ে বলেন, “শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানে কোম্পানির জন্য পাতা তুলে আমি সপ্তাহে মাত্র ‘১৩৩০ টাকা’ পাই। এই টাকা দিয়ে আমি আমার মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ করতে পারি না; আমার পরিবারকে প্রতিদিন অনেক সংগ্রাম করতে হয়। তবে কোম্পানি আমাদের একটি ঘর দিয়েছে, যেখানে আমি আমার ছেলে, পুত্রবধূ এবং মেয়েদের নিয়ে থাকি।”
মিনি হাজরার মতো বাংলাদেশের চা বাগানগুলোর অনেক শ্রমিকই এখনও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশের চা বাগানগুলোতে প্রায় ১,১৭,০০০ শ্রমিক কাজ করছেন। এছাড়াও আরও ৫৬,০০০ শ্রমিক রয়েছেন যারা অস্থায়ী হিসেবে কাজ করেন, যাদের কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি নেই। যারা চা পাতা সংগ্রহ করেন, তাদের প্রায় সবাই নারী। এই শ্রমিকদের প্রায় ‘৯৫ শতাংশই হিন্দু ধর্মাবলম্বী’ এবং তারা বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও উৎসব পালন করেন।
গত বছর বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে প্রায় ৯ কোটি ৫৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। দেশে বার্ষিক চায়ের চাহিদা ১০ কোটি কেজি, যা উৎপাদনের চেয়ে বেশি। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রতি বছর ১০ লাখ কেজি চা রপ্তানি করে। তবে চা শিল্প এখন কিছুটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; অনেক শ্রমিক কাজ পাচ্ছেন না এবং অনেক জায়গায় চা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
চা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের প্রধান কারণ হলো চা উৎপাদনের খরচ অনেক বেশি, কিন্তু বিক্রয় মূল্য অনেক কম, যা এই শিল্পকে অলাভজনক করে তুলেছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষে মে দিবস পালন করছেন।
মিনি হাজরা আরও যোগ করেন, “আমার দুই মেয়ে এবং এক ছেলে। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী, একটি পরিবার থেকে মাত্র একজন চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারেন। যদি সেই ব্যক্তি মারা যান বা অবসরে যান, তবেই আমার ছেলে বা পুত্রবধূ সেই কাজ পেতে পারেন। তাই মাত্র একজনের আয়ে আমাকে পুরো পরিবার চালাতে হয়, যা অত্যন্ত কঠিন।”
শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, “শিক্ষার জন্য কোম্পানির প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, কিন্তু আমার বাচ্চারা সেখানে বেশিদিন পড়াশোনা করতে পারে না; তারা সাধারণত ঝরে পড়ে। চিকিৎসার জন্য কোম্পানি একটি ছোট ক্লিনিক করেছে, কিন্তু সেখান থেকে শুধু প্যারাসিটামলের মতো সাধারণ ওষুধ দেওয়া হয়। তাই আমাদের ভাগ্যের আসলে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।”
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৮৫৪ সালে বাংলাদেশের এই পূর্বাঞ্চলে (যা তখন অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিল) প্রথম চা চাষ শুরু হয়। অনেক শ্রমিক এখানে কাজ করতে আসেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই ঘন জঙ্গলে কাজ করার সময় বাঘ, চিতাবাঘ এবং অন্যান্য বন্য প্রাণীর আক্রমণের শিকার হন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ অ্যালয়সিয়াস কন্দ বলেন, “চা শ্রমিকরা ভালো অবস্থায় নেই। তারা মৌলিক অধিকার এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যার প্রধান কারণ তাদের মজুরি অত্যন্ত কম। আয়ের পরিমাণ কম হওয়ায় তারা তাদের পরিবারের খরচ চালাতে পারেন না এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করতে পারেন না।”
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা পরেশ কালেন্দি বলেন, “চা শ্রমিকদের সংকট অন্য শ্রমিকদের থেকে ভিন্ন। অন্য শিল্পে শ্রমিকরা বিল্ডিংয়ের নিচে কাজ করেন। চা শ্রমিকরা কাজ করেন খোলা আকাশের নিচে। চা শ্রমিকদের কোনও ভূমি নেই। তারা কোম্পানির ডরমেটরিতে গাদাগাদি করে থাকেন। তাদের কোনও স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় চাকুরির আবেদন করতে পারেন না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চা শ্রমিকরা বঞ্চিত।”
চা শ্রমিক নেতা বিজয় হাজরা বলেন, “চা শ্রমিকরা তাদের জীবনযাত্রায় বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং চা শিল্প একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের কারণ বুঝতে এবং শ্রমিকরা কেন তাদের অধিকার পাচ্ছে না তা জানতে সরকারের উচিত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া, কারণ চা শিল্প আমাদের দেশের একটি মূল্যবান খাত।”

