কাজী আবদুল ওদুদের ‘শাশ্বত বঙ্গ’- কবির রায়হান


কবির রায়হান
কাজী আবদুল ওদুদের ‘শাশ্বত বঙ্গ’

 

সমগ্র বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে কাজী আবদুল ওদুদ একজন উদার, অসাম্প্রদায়িক ও বিশিস্ট মানবতাবাদী প্রবন্ধকার। তিনি যখন প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন, তখন বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচলন কেবল শুরু হয়েছে। তাই, তৎকালীন সময়ে বাঙালী মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত বিতর্কিত প্রবন্ধকার। যেহেতু মুসলমান ঐতিহ্যের মধ্যেই তাঁর জন্ম, এজন্য বাঙালী মুসলমান সমাজের সংকট ও সম্ভাবনা, গোড়ামী ও ধর্মান্ধতা এবং অশিক্ষা ও অনুদারতা তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্যের একটা বিরাট অংশ জুড়ে আছে। তখনকার সময়ে তাঁর মত প্রাগ্রসর, উন্নত ও আধুনিক চিন্তাধারার মুসলমান লেখক কম ছিলেন। প্রখ্যাত ছন্দ বিশেষজ্ঞ ও কবিসমালোচক আবদুল কাদির সাহেব কাজী আবদুল ওদুদকে বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম ভাবুক ও চিন্তাবিদ হিসেবে অভিহিত করেছেন ।

তিনি অর্থনীতি শাস্ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রীধারী হয়েও সরকারী কলেজে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এটা তাঁর সাহিত্য প্রীতি ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি। বাংলার মুসলমান সমাজের জড়তা, অন্ধতা ও গোড়ামীর মুলোৎপাটন করে আধুনিকতা, সভ্যতা ও মানবতার ঝা-াকে উড্ডীন করবার অভিপ্রায়ে ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। একদল তরুণ অথচ আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক ছিলেন এই সমাজের সদস্য। এঁদেরই অগ্রনায়ক ও প্রানপুরুষ ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ। মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্মমন্ত্র ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। তিনি আজীবন এই জ্ঞান, বুদ্ধি ও মুক্তি সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। বিতর্কিত হয়েও তিনি বুদ্ধির মুক্তির মূলমন্ত্র থেকে বিচ্যুত হননি। একজন ভাবযোগী সাধকের মত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে দুঃসাহসী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং উত্তর সুরীদের উপর তাঁর চিন্তাধারার প্রভাব অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে পড়েছিল।
বাংলা প্রবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যে তিনি একজন প্রথম শ্রেণীর লেখক। গত শতাব্দীর বিশের দশকের প্রারম্ভেই বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে কাজী আবদুল ওদুদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সাহিত্য জীবন ‘মীর পরিবার’ নামক ছোট গল্প গ্রন্থ দিয়ে শুরু হলেও তাঁর আসল ও প্রধান পরিচয় তিনি একজন পরিশ্রমী প্রবন্ধকার ও সমালোচক। তিনি সর্বমোট বাইশ খানা গ্রন্থের রচয়িতা। সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, দর্শন ও রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ রয়েছে। ‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ’ (দুই খ-), ‘কবিগুরু’ গ্যেটে (দুই খ-) ও শাশ্বত বঙ্গ’’- এই তিনখানা তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ। এই তিনখানি গ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা প্রবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আমি আমার আলোচনা তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শাশ্বত বঙ্গের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবো।

কাজী আবদুল ওদুদের ‘শাশ্বত বঙ্গ’ পাঁচশত পৃষ্ঠাব্যাপী এক সুবিশাল প্রবন্ধ গ্রন্থ। তাঁর পূর্বপ্রকাশিত ‘নজরুল প্রতিভা’, ‘আজকার কথা’, ‘হিন্দু মুসলমানের বিরোধ’, ‘সমাজ ও সাহিত্য’, নবপর্যায় এবং ‘রবীন্দ্র কাব্য পাঠ’ নামক ছয়খানা ছোট ছোট প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘শাশ্বত বঙ্গ’ প্রবন্ধ গ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। একারনেই গ্রন্থখানির কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। জার্মান সাহিত্য, সংস্কৃত সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শন ও রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে এই গ্রন্থখানিতে বিচিত্রমুখী আলোচনা লক্ষণীয়। জার্মান সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা- কবি গ্যেটের সাহিত্য সাধনায় মুগ্ধ, আবার সংস্কৃত সাহিত্যের কালপুরুষ মহাকবি কালিদাশ তাঁর কাছে একজন বিষ্ময়কর প্রতিভা। ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা তাঁর কাছে এক বিষ্ময়।

বাংলাদেশের প্রবন্ধকার আবদুল হক আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘শাশ্বত বঙ্গের’ শ্রেষ্ট প্রবন্ধ ‘সম্মেহিত মুসলমান’। বস্তুতপক্ষে ‘সম্মোহিত মুসলমান’ প্রবন্ধের ভাবতম্ময়তা, বিশ্লেষন ধর্মিতা ও ভাষার কাব্যধর্মীতার জন্য বাংলা সাহিত্যে একটি অনত্যম শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ হিসাবে পরিগনিত হয়েছে।’ কাজী আবদুল ওদুদ ‘সম্মোহিত মুসলমান’ নামক প্রবন্ধে বলেছেন-‘যুক্তি বিচার যতই অপুর্ণাঙ্গ হোক, জীবন পথে বাস্তবিকই এ যে মানুষের এক অতি বড় সহায়। এর সাহায্যের অভাব ঘটলে পূর্বানুবর্তিতা পাষানভারের মতই মানুষের জীবনের উপরে চেপে বসে, দেখতে দেখতে তাঁর সমস্ত চিন্তা ও কর্ম প্রবাহ শুষ্ক ও শীর্ন হয়ে আসে’। এই প্রবন্ধের অন্যত্র বলেছন- ‘কোন সাধনার উত্তরাধিকার বংশসূত্রে নির্নীত হয় না, গতানুগতিক শিষ্যত্ব সূত্রেও নির্নীত হয় না, হয় সাধনা সূত্রেই’। যুক্তি, বুদ্ধি ও বিচার বিবেচনা পূর্বক জীবন সমস্যার সমাধানে এগিয়ে যেতে হবে। স্বকীয় কর্মপ্রয়াস ও নিরলস সাধনার ফলশ্রুতি হিসেবেই সাফল্যের জয়মাল্যে ভূষিত হওয়া যায়।

মোস্তফা কামাল পাশা আধুনিক মুসলিম জীবনে একজন প্রবল পরাক্রান্ত কর্মীপুরুষ ও রাষ্ট্রনায়ক। সমগ্র মুসলিম জগতে তুর্কী বীর কামাল পাশা সর্বপ্রথম ধর্মনিরপেক্ষ ইহজাগতিক চেতনায় উদ্দীপ্ত হন এবং তুর্কী জাতিকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও গোড়ামীমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করেন। এই কর্মীপুরুষ সম্পর্কে আলোচনা বাংলা ভাষায় তেমন হয়নি। কাজী আবদুল ওদুদ তাঁর ‘মুস্তফা কামাল সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘মানুষের যে জাগতিক জীবন, এই জাগতিক জীবন যদি সুন্দর না হয়, সুব্যবস্থিত না হয়, তবে সত্যকার নৈতিক জীবন, আধ্যাত্মিক জীবন, তার পক্ষে সুদুরপরাহতই হয়ে থাকে’। একথা দিবালোকের মত স্পস্ট যে, অর্থনৈতিক জীবনই মানবজীবনের স্তম্ভস্বরূপ। মানুষের এই অর্থনৈতিক জীবন যদি নড়বড়ে হয়, অব্যবস্থিত হয়, তবে সেই মানুষ ও জাতির পক্ষে কোনো মহৎ কাজ আশা করা যায় না। তিনি উক্ত প্রবন্ধে আশা প্রকাশ করেন যে, ‘সত্যের আঘাত বড় প্রচন্ড। মুসলমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গতানুগতিকতাকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়ে নব সৃষ্টির প্রয়োজন ও সম্ভাবনা দেখিয়ে, মুসলমান সমাজের বুকে কামাল যে সত্যকার আঘাত দিয়েছেন, আশা করা যায়, এই আঘাতেই আমাদের শতাব্দীর মোহ নিদ্রার অবসান হবে। ধর্মে, কর্মে জাতীয়তা, সাহিত্যে সমস্ত ব্যপারেই আমাদের ভিতরে স্থান পেয়েছে যে জড়তা, দৃষ্টিহীনতা, মনে আশা জাগছে, যেমন করেই হোক এইবার তার অবসান আসন্ন হয়ে এসেছে।’

কাজী আবদুল ওদুদ যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, আসলে কি মুসলমানের বিশেষ করে বাঙালী মুসলমানের সেই জড়তা ও দৃষ্টিহীনতার অবসান হয়েছে? বাঙালী মুসলমানদের গতানুগতিক ও নিরানন্দ বন্ধ্যা সাংস্কৃতিক জীবন পর্যবেক্ষন করলে এ কথা স্পস্টতই প্রতীয়মান হয় যে, তার মোহনিদ্রার অবসান তেমন ঘটেনি। পর্যাপ্ত আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটলেও তার জীবন দর্শনে ও জীবন জিজ্ঞাসায় এখনো পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকতা, ইহজাগতিকতা ও আধুনিকতার মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়নি। তিনি উক্ত প্রবন্ধের শেষাংশে বলেছেন- ‘জীবন-সমস্যার চরম সমাধান কোনোকালেই শেষ হয়ে যায়নি। নূতন করে সে সমস্ত বিষয়ে সচেতন হওয়া আর তার মীমাংসা করতে চেষ্টা করা- এইই জীবন।’ মানুষের জীবনে সমস্যার অন্ত নেই। একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এসে মানুষের জীবনে অসংখ্য সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সমস্যা বিহীন জীবন অকল্পনীয়। তবুও মানুষ জীবন জিজ্ঞাসু মানুষ অগনিত সমস্যার সমাধানকল্পে ক্লান্তিহীনভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। এ পরিশ্রম ও সাধনা চলবে অনন্তকাল ধরে। তিনি এই প্রবন্ধের অন্যত্র বলেছেন- ‘হযরত ওমর আর হারুন-অর-রশীদ উভয়েই ছিলেন খলিফা, কিন্তু একজনের এফতারী ছিল চারটি ছোলা আর একজনের বাবুর্চিখানার দৈনিক খরচ ছিল দশ হাজার দিরহাম। অথচ হারুন-অর-রশীদকে মুসলমান ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া চলে না, বাদ দিলে মুসলমানের গৌরব সৌধের এক বিরাট স্তম্ভই ভূমিসাৎ হয়ে যায়। তেমনভাবে ইবনে রুশদ আর ইমাম গাজ্জালী দুজনেই মহাপন্ডিত মুসলমান, কিন্তু একজনের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তি বিচার, আর একজন শাস্ত্র¿ানুগত্যকে শ্রেয়োলাভের এক বড় পথ বলেই জানেন।’ বাঙালী মুসলমান বৈচিত্রহীনতা, সংস্কৃতিহীনতা ও চিন্তাহীনতা থেকে মুক্ত হয়ে সবল, সুস্থ্য ও শক্তিশালী হয়ে উঠুক- কায়মনোবাক্যে কাজী আবদুল ওদুদ আমৃত্যু তাই কামনা করেছিলেন।

তিনি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন একটা আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই। তিনি সাহিত্যকে কেবল মাত্র ভাবসর্বস্ব, কল্পনা সর্বস্ব ও কলানৈপুন্যের বাহন মনে করেননি। তাঁর আদর্শ ছিল বুদ্ধির মুক্তি। তিনি বলেছেন- ‘সাহিত্যের উদ্দশ্য জীবনের সমস্যার সমাধানের প্রয়াস। এই প্রয়াস জ্ঞাত সারেও হতে পারে, অজ্ঞাত সারেও হতে পারে। সাহিত্য হচ্ছে সৌন্দর্যময় জ্ঞান’। সাহিত্য সাধনাকে তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বাঙালী মুসলমান সমাজের সংকট ও সম্ভাবনাই ছিল তার প্রবন্ধ সাহিত্যের প্রধান বিষয়বস্তু। তিনি চেয়েছিলেন- বাঙালী মুসলমান জীবনের সর্বক্ষেত্রে গোড়ামী মুক্ত হোক, মোহমুক্ত হোক, জ্ঞানের সাধনায় দিগি¦জয়ী হোক, সমাজ, ধর্ম ও জীবন জিজ্ঞাসায় বস্তুনিষ্ঠ হোক; বস্তুবাদী ও ইহজাগতিক চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হোক; সৌম্য, নিরাসক্তও নিরপেক্ষভাবে জ্ঞান সাধনায় এগিয়ে আসুক, হয়ে উঠুক সর্বসংস্কার মুক্ত, আধুনিক ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর অধিকারী, চেতনা ও মন-মানসিকতায় হয়ে উঠুক উদার ও অসাম্প্রদায়িক, রাখুক বুদ্ধিকে পরিচ্ছন্ন ও নিষ্কলুষ এবং সর্বোপরি বেড়ে উঠুক একাধারে জাতীয়তাবাদী বাঙালী ও প্রগতিশীল মুসলমান হিসেবে। কাজী ওদুদের চিন্তা বিফলে যায়নি। তার প্রমান আজকের বাংলাদেশে একদল শক্তিশালী, উদার ও প্রগতিশীল শিক্ষিত মানুষ তৈরী হয়েছে।

‘শাশ্বত বঙ্গ’ প্রবন্ধ গ্রন্থের লেখক কাজী আবদুল ওদুদ বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে একজন মুক্ত বুদ্ধি সম্পন্ন উদার চিন্তাশীল অসাম্প্রদায়িক ও শক্তিমান প্রবন্ধকার এবং ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের একজন অন্যতম প্রধান অগ্রপথিক।

Related posts