পথ খুঁজছে দিশেহারা বিএনপি

দেশের খবর: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কল্পনাতীত ফল বিপর্যয়ে দিশেহারা বিএনপি। এখন নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে দলটি। যদিও প্রাথমিকভাবে ভোটের তিন দিন পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনকে প্রার্থীদের মাধ্যমে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রণ্ট। পরবর্তী সময়ে নতুন কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। তবে আপাতত হরতাল-অবরোধের মতো বড় কর্মসূচি দেবেন না বলে জানা গেছে।

নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে দাবি করে পুনর্নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন। বিপুল বিজয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনে ‘কারচুপি’র অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি আদায়ে কতটুকু সফল হবে বিএনপি- এ নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা ও হিসাব-নিকাশ।

দলীয় নেতারা বলছেন, কোনোভাবেই এ নির্বাচন মেনে নেবে না বিএনপি জোট। ঐক্যফ্রন্টের সাত বিজয়ী শপথ নেবেন না। ‘সাজানো’ নির্বাচন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। ভোট কারচুপির তথ্য-উপাত্ত বিদেশি গণমাধ্যম, কূটনীতিক ও সুশীল সমাজকে অবহিত করা হবে। এ লক্ষ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া জোটের সব প্রার্থীকে স্ব-স্ব আসনে যাবতীয় অনিয়মের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত সংকলন করে শিগগির তা প্রকাশ করা হবে। এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির আন্তর্জাতিক উইংয়ের নেতারা বৈঠক করেছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে আমাদের নির্বাচনে নিয়ে ভোটের নামে নিষ্ঠুর প্রহসন করা হয়েছে। ভোটের আগের দিন রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। নির্বাচন বাতিলের দাবিতে জোটের প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দেবেন। এর পর নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে। কোনোভাবেই ভোট ডাকাতির নির্বাচন মেনে নেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনে বিএনপি মাত্র পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছে- এটা অবিশ্বাস্য।’ বিএনপি নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “এ মুহূর্তে কোনো হটকারী চিন্তাভাবনা ও কর্মসূচি গ্রহণ না করাই ভালো। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ মুহূর্তে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন’ গঠনের দাবি তোলা যেতে পারে। নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখবে ওই কমিশন; যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। নির্বাচন নিয়ে যাতে কারও মনে কোনো প্রশ্ন না থাকে।”

প্রশ্নের জবাবে এমাজউদ্দীন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিএনপির উচিত হবে তাদের কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা খুঁজে বের করে সংশোধন করা। নির্বাচনে প্রার্থীরা ভোটকেন্দ্রে প্রথম পাঁচজন এজেন্টের বিকল্প আরও দ্বিতীয় পর্যায়ে পাঁচজন করে এজেন্ট তৈরি রাখার কৌশল নিতে পারতেন। পাশাপাশি সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে কর্মী ও সমর্থকের ঐক্যবদ্ধ করে ভোটকেন্দ্রে থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে প্রার্থীরা আরও তৎপর হতে পারতেন।

সূত্র জানায়, নির্বাচনের ফলাফলে হতাশ বিএনপি নেতারা পরবর্তী করণীয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে এবং জোটের সঙ্গে দফায় দফায় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। সোমবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে মিলিত হন। গতকালও অনানুষ্ঠানিকভাবে দল ও জোটের শীর্ষ নেতারা করণীয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। এসব বৈঠকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত হয়নি বলে মত দেন অনেকে।

তবে নীতিনির্ধারক নেতারা বলছেন, দেশের সুশীল সমাজ ও বিদেশিরা নির্বাচনে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। এ জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না থাকা সত্ত্বেও তারা অংশ নেন। বিদেশিদের কথায় অংশ নিয়ে দল এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কোনো কোনো নেতা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে বিদেশিদের স্বীকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। বিজয়ী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ভারত ও চীন অভিনন্দন জানিয়েছে। এ ব্যাপারে বিএনপির আন্তর্জাতিক উইংয়ের নেতারা ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানান তারা।

বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের কয়েক নেতা জানান, বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আপাতত রাজপথে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি না দেওয়ার পক্ষে মত দেন বেশিরভাগ নেতা। আগে দেশি-বিদেশিদের সামনে ভোটে কারচুপি ও অনিয়মের প্রমাণ তুলে ধরে জনমত পক্ষে আনা হবে। ইতিমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের স্ব স্ব রিটার্নিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে তথ্যপ্রমাণসহ অনিয়মের অভিযোগ দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পর বৃহস্পতিবার মিছিল সহকারে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দেবেন প্রার্থীরা।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘এবারের একতরফা নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে। নির্বাচনে প্রশাসনকে ক্ষমতায় আসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষ এই দুর্বিষহ পরিস্থিতির অবসান চায়। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে জনগণের প্রত্যাশাকে মূল্য দিতে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলব।’

তৃণমূল নেতাদের প্রশ্ন: নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তৃণমূল নেতাদের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাগারে যাওয়ার পর গভীর সংকটে পড়ে বিএনপি। ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গড়ে সুদিনে ফেরার স্বপ্ন দেখে তারা। নির্বাচনে বিপর্যয়ে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হাইকমান্ডের ওপর। যুবদল নেতা সাইফুল ইসলাম জানান, এ নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত হয়নি। নির্বাচনের তিন দিন আগেই কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচন বর্জনের ডাক দেওয়া উচিত ছিল। তাহলে বিএনপিকে এ নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।

Related posts