অনলাইন ডেস্ক : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এখনও চেয়ারে বহাল থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণহত্যার সময় তার (রাষ্ট্রপতি) ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা সবকিছু আমরা জানি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, একজন দুর্নীতিবাজ, অপদার্থ, মিথ্যুক, গণহত্যার দোসর এখনও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আমি শুনিও নাই, পড়িও নাই। তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমরা খুব স্পষ্টভাবে বলেছিলাম রাষ্ট্রপতির অপসারণ ও গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতির কোনো অধিকার নেই বঙ্গভবনে থাকার, এখানে এসে বক্তব্য দেওয়ার।”
পেশাগত জীবনে মো. সাহাবুদ্দিনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, “তাকে তিনটি লক্ষ্য দিয়ে দুদকের কমিশনার করা হয়। এর এক নম্বর হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের নিশ্চিত করা। দুই নম্বর হচ্ছে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্লিনশিট দেওয়া। তিন নম্বর হচ্ছে, ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিন সরকারের সময় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলা বাতিল করা। এমন একজন ব্যক্তিকে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখনও মেনে নিচ্ছে।”
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এস আলমের হাতে ইসলামী ব্যাংককে তুলে দেওয়ার কারিগর। এস আলম দুই কোটি আমানতকারীকে পথে বসিয়েছিল।”
রাষ্ট্রপতির কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়া প্রসঙ্গে সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ বলেন, “তখনকার সময়, আর বর্তমান সময় এক নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আমাদের সামনে দুইটা অপশন ছিল। আমরা বলেছিলাম, জাতীয় সরকার করতে হবে। সেই প্রস্তাব বিএনপি নাকচ করে দিয়েছে। আরেকটা অপশন ছিল, ক্ষমতা আর্মির হাতে তুলে দেওয়া। যদি আমরা সেই দিকে আগাতাম আজকে তারা (সরকারি দল) এখানে বসতে পারতাম কি না সেটা সন্দেহ আছে।”
সাবেক এই উপদেষ্টা জানান, দেশের স্থিতিশীলার স্বার্থে তাঁরা সে সময় সরকারে গিয়েছিলেন। এখন নির্বাচিত সরকার। চাইলে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে। বিএনপিতে সে ধরনের যোগ্য ও আস্থাভাজন লোক রয়েছে। রাষ্ট্রপতিকে জিয়াউর রহমানের প্রশংসা করা হয়েছে। গাধাকে দিয়ে হাল চাষ করিয়ে কোনো ‘বাহাদুরি নেই’। এটি সরকারের দেউলিয়াত্ব।
জুলাই জাতীয় সনদকে অন্তহীন প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে বিএনপি এবং এই সনদকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করে এর মাহাত্ম্য কলুষিত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসলকে একটা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে কলুষিত করা হয়েছে। সনদে লেখা হয়েছে- কোনো দল নির্বাচনে জিতলে তাদের ইশতেহার অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। তাহলে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন কী? বিএনপি জুলাই সনদকে প্রতারণার দলিলে পরিণত করেছে।”
তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ যেমন বাহাত্তরের সংবিধানকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করেছিল, একইভাবে বিএনপিও এখন জুলাই সনদকে ব্যবহার করছে। জুলাই গণভোট একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও গণরায় ছিল। সেই রায় অনুযায়ী দ্রুত সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠন করা উচিত। কিন্তু বিএনপি এখন সংস্কারের পথ থেকে সরে গিয়ে কেবল নির্বাচনের ইশতেহারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।”
দেশের রাজনীতিতে ‘সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি’- এই সংস্কৃতির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও সংসদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে ভাগ থাকবে এটি মানুষ প্রত্যাশা করে না।”
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের রাজনীতি বিগত ৫০ বছর ধরে চলছে। কিন্তু এর সমাধান কেন করতে পারেনি। বিএনপি কি দায় নেবে না, ২৯ বছর জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করেছে। এখন সবাই বলে- সাথে থাকলে সঙ্গী, না থাকলে জঙ্গি। এর মীমাংসা করার দায়িত্ব ছিল বড় দলগুলোর।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, “সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ইতিহাসের এই বির্তক আমাদেরকে সমাধান করতে হবে। সব পক্ষকেই এটির জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ যেমন কোনো দেশের ষড়যন্ত্র না, আবার মুক্তিযুদ্ধের নাম করে এ দেশে যে লুটপাট, ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে সেটাও ভোলা যাবো না।”
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ফাউন্ডেশন, এটি নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধেরই নবায়ন। আমাদের উচিত ইতিহাসের এই বিতর্ক একপাশে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের নাম করে বা পক্ষ-বিপক্ষ কার্ড খেলে জনগণকে আর ভাগ করা যাবে না।”
বর্তমান সংসদ সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। যার অধিকাংশই সরকারি দলের এবং তারা বড় মাপের ঋণখেলাপি বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
এই বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করার সুবিধা দিতেই একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
টিআইবির দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বর্তমান সরকারি দলের যারা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। সংসদ সদস্যদের ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। নির্বাচনের আগে তারা কিছু টাকা জমা দিয়ে এগুলো পুনঃতফসিল করে নিয়েছে। আর বর্তমান গভর্নর এই পুনঃতফসিল কাজেই এক্সপার্ট। সেজন্যই তাকে এই পদে বসানো হয়েছে।”
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করা হয়েছে যাতে হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যায়। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতে সাধারণ মানুষের আর কোনো আস্থা নেই বলেও দাবি করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
নাহিদ বলেন, “৯০ এর গণঅভ্যুত্থান আর ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান এক নয়। এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের নেতারা পেছনে ছিলেন আর সামনে ছিলেন সাধারণ মানুষ ও ছাত্ররা। জুলাই আন্দোলন কোনো দলের একক আন্দোলন নয়।”
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, “১৯৭১ এর পর ভারত বাংলাদেশকে করদ রাজ্য করতে চেয়েছে। সীমান্তে হত্যা হচ্ছে, বাংলাভাষী মুসলমানদের তারা বাংলাদেশি বলে পুশইন করছে। বাংলাদেশে যে ফ্যাসিবাদ তাকে সমর্থন জানিয়েছে ভারত। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ, কিন্তু সাম্য ও মর্যাদার ভিত্তিতে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
জামুকা আইন সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা থেকে মুজিব বাহিনীকে বাদ দেওয়ার প্রসঙ্গও তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, “মুজিব বাহিনীর সদস্যদের যুক্ত করে অতীতে বহু ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেওয়া হয়েছিল। তারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ বাদে অন্য পক্ষের লোকদের হত্যা করেছে। বর্তমান আইনে মুজিব বাহিনী আর মুক্তিযোদ্ধা নয়। কিন্তু এখনো কেউ কেউ নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। এ জায়গায় স্পষ্টতা আনা দরকার।”
দুর্নীতি ও ঋণখেলাপি সংসদ সদস্যদের প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। কয়েকজন সংসদ সদস্যের ঋণের পরিমাণ ১৭০০ কোটি, ৭৬৫ কোটি, ৬৭৯ কোটি, ৬২১ কোটি, ২০১ কোটি, ১৮২ কোটি ও ৯৭ কোটি টাকার অঙ্ক উল্লেখ করেন। তবে নাম বলেননি। পরের সেশনে নাম বলবেন বলেও ঘোষণা দেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ। তার দাবি, দুই মাসে বিএনপির হাতে ৩১ জন খুন হয়েছে, ১৪টি ধর্ষণ, ৮৩টি চাঁদাবাজি ও ১৫৪টি হামলার খবর এসেছে। কিন্তু সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের শাহবাগ থানার সামনে মারধর এবং মামলা না নেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। তার ভাষায়, থানার ভেতরে ঢুকে ওসির কক্ষে ডাকসুর দুই নির্বাচিত প্রতিনিধির ওপরও হামলা হয়েছে।
মাজারে হামলা নিয়েও উদ্বেগ জানান নাহিদ ইসলাম। কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা করে একজনকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ধর্মীয় বিতর্কে আমরা ঢুকব না। তবে আইনের শাসনের প্রশ্নে এ সব ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।”
কৃষকদের ধান কেনার দামের প্রসঙ্গ টেনে ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য বলেন, “সরকার কৃষি কার্ড দিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু গত বছরের দামে এবারও কৃষকের ধান কেনা হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে কৃষক লোকসানে পড়বেন।”
জুলাই গণহত্যার বিচার নিয়েও তিনি আইনমন্ত্রীর কাছ থেকে সংসদে নিয়মিত ব্রিফিং চান। একই সঙ্গে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং বর্তমান সরকার আরও বৃদ্ধি করবে আশা প্রকাশ করেন নাহিদ।
চাকরি ও কর্মসংস্থান নিয়ে নাহিদ বলেন, “আন্দোলনের শুরুই হয়েছিল চাকরির দাবিতে। তাই আর্থিক খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে, বিনিয়োগ আনতে হবে এবং সরকারি চাকরিতে স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতি একদম বন্ধ করতে হবে।”
বিরোধী দল কীভাবে কথা বলবে, তা সরকার শিখিয়ে দিতে পারে না মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বিরোধী দল সরকারের ‘প্রেসক্রিপশন’ অনুযায়ী বিরোধিতা করবে না। বিরোধী দল বিরোধিতা করবে, সমালোচনা করবে, জনগণই ঠিক করবে বিরোধী দলকে কতটা সমর্থন দেবে।”
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নাহিদ বলেন, “খালেদা জিয়া গ্রেপ্তারের পরদিন তার বাবাও রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মায়ের সঙ্গে থানা, আদালত ও কারাগারে ঘুরেছি। আমার এই অভিজ্ঞতা ফ্যাসিবাদবিরোধী লাখ লাখ মানুষের রয়েছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে মনে করেছি দায় রয়েছে। আমার সামনে একজন স্বৈরশাসক থাকবে তা মেনে নিতে পারিনি।”
নিজের নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১১ এর কথা তুলে নাহিদ বলেন, “ঢাকা-১৭ ও ঢাকা-১১ এর মধ্যেও তেমন বৈষম্য আছে। আশা করি এই বৈষম্য দূর হবে। আমার আসনে নানা সমস্যা। আশা করি আমার এলাকার প্রতি বিরূপ কোনো মনোভাব তৈরি যেন না হয়।”
দীর্ঘ বক্তব্যের একেবারে শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, “সংসদের প্রথম অধিবেশন দেখে আমি হতাশ হয়েছি।”
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আরও বলেন, “সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের সদস্যরা অতিরিক্ত স্তূতি করেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল করা হয়েছে, গণভোটকে অস্বীকার করা হয়েছে।
আমি আশা করব, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি, সেই সব প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।”

