এমপিও বানিজ্যে পিছিয়ে নেই সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজ

ডেস্ক রিপোর্ট :  অনিয়ম আর জালিয়াতির মাধ্যমে গত এক বছরে ১৪ শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজ। অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ২০১৮ সালের ২৮ আগস্টের পর থেকে পর্যায়ক্রমে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ নিয়ে সাতক্ষীরার সদরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাল জালিয়াতির ধারাবাহিকতায় এই কলেজেও একই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই কলেজের গভর্নিং কমিটির সভাপতি সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি। তবে, তিনি বলেন ‘নিয়োগের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’ কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ শফিকুজ্জামান বলেন ‘নিয়োগে কোন জালিয়াতি নেই।’
সূত্র জানায়, গত ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সকল এমপিও ভূক্ত কলেজে শিক্ষকদের শূন্যপদে নিয়োগ প্রদানে গভর্নিং কমিটির ক্ষমতা রহিত করে। এর পরিবর্তে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে নতুন নিয়োগের বিধান চালু করা হয়। এই প্রজ্ঞাপনের আরো ১০ বছর পূর্বে ২০০৫ সালের ২০ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করে। অর্থাৎ ২০ এপ্রিল ২০০৫ সালের পর নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ উপাধ্যক্ষ ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছাড়া সাধারণ শিক্ষকদের সরাসরি নিয়োগ পাওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু জাল জালিয়াতির সাথে যুক্ত একটি চক্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র উপেক্ষা করে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজে মাত্র এক বছরে ১৪ জন শিক্ষককে এমপিও ভুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ২৮ আগস্ট ২০১৮ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব কামরুল হাসান স্মাক্ষরিত এক পরিপত্রের মাধ্যমে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী তারিখের পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত বেসরকারী শিক্ষ প্রতিষ্ঠান এর ডিগ্রিস্তরে তৃতীয় শিক্ষকগনকে জনবল কাঠামোর শর্তাদি পূরণ সাপেক্ষে এমপিও ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ১২ মার্চ ২০১৯ তারিখে আরো একটি পরিপত্রের মাধ্যমে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী তারিখের পরে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিগ্রিস্তরের তৃতীয় শিক্ষকগনকেও এমপিও ভুক্ত করার জন্য নাম প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। তবে এই পরিপত্রের ২নং শর্তে বলা হয়, “ডিগ্রিস্তরের এমপিও কোর্ডপ্রাপ্ত কলেজে অনার্স ও মাস্টার্সপর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগনের নাম তালিকাভুক্ত করা যাবে না।
তারপরও এসব শর্ত ভঙ্গ করে একের পর এক এধরণের এমপিও অব্যাহত থাকায় সম্প্রতি এমপিও শীটে এ সম্পর্কে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়েছে। সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, “যদি কোন শিক্ষক রীতি শুদ্ধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত না হয়ে এমপিও ভুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে সেব শিক্ষক কর্মচারীদের বিল প্রণয়ন ও বেতন প্রদান করা যাবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সভাপতি এর জন্য দায়ী হবেন। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে এমপিওতে থাকা উক্ত শর্তাবলী ছাড়াও প্রতিটি বিষয়ে নূন্যতম শিক্ষার্থী থাকার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটাও অনুসরণ করা হচ্ছে না সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজে। বর্তমানে ডিগ্রি পর্যায়ে এই কলেজে ২৫ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এছাড়া আগামীতে আরো ৫ জনের এমপিও ভুক্তির জন্য কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। এখানে বর্তমানে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রথম বর্ষে ৫২ জন, দ্বিতীয় বর্ষে ৮৫ জন এবং তৃতীয় বর্ষে ৮৩ জন। যদিও এরমধ্যে আবার অনেকে ড্রপআউট হয়েছেন।
এদিকে ২৮ আগস্টের পরিপত্র অনুযায়ী ডিগ্রিস্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত না হয়েও তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে এবং নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও শূন্যপদে সাতক্ষীরা দিবা নৈশ্য কলেজের ১৪জন শিক্ষককে জালজালিয়াতির মাধ্যমে এমপিও ভুক্ত করানো হয়েছে। উক্ত শিক্ষকরা হলেন, রিনাত রুবাইয়া- অর্থনীতি, চম্পা বিশ্বাস- সমাজ কর্ম, মোঃ ফারুক হোসেন- রাষ্ট্র বিজ্ঞান, শাহিনা আক্তার- রাষ্ট্র বিজ্ঞান, প্রতিভা রানী- সমাজ বিজ্ঞান, শাহজাহান আনসারী- মার্কেটিং, পুরজিত কুমার মিস্ত্রি- ভূগোল, রোজিনা আক্তার- ইংরেজী, মহিনুর ইসলাম- বাংলা, মোঃ মহিবুল্লাহ- হিসাব বিজ্ঞান, কানিজ আল আঞ্জুমানারা নাহার- ব্যবস্থাপনা, গোলাম মোস্তফা- ইসলামের ইতিহাস ও তাপস কুমার আমিন- সংস্কৃত। এর মধ্যে সমাজকর্ম, রাষ্ট্র বিজ্ঞান এবং সংস্কৃত শূন্যপদে এমপিও করানো হয়েছে। অন্যদেরকে ডিগ্রিস্তরের তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে এমপিও করানো হয়েছে।
২০১৩ সালের পর থেকে সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজে পর্যায়ক্রমে ১৪টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। উল্লেখিত শিক্ষকদের মধ্যে অধিকাংশই ২০১৩ সালের পর বিভিন্ন সময়ে অনার্সের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে এই কলেজে চাকুরী করেছেন। তারা হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন। কলেজ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতাও উত্তোলন করেছেন। কিন্তু অনার্সের শিক্ষক থেকে রাতারাতি ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষক হতে এবং নতুন করে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারীর পূর্বে ডিগ্রি পর্যায়ে নিয়োগ দেখাতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও রেজুলেশন কিভাবে ঠিক করা হয়ে তা নিয়ে কলেজের অনেকেই বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। ডিগ্রির তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে যাদের এমপিও হয়েছে তাদের দুই একজন বাদে অন্য কারো ডিগ্রি পর্যায়ে নিয়োগ ছিল না বলে জানিয়েছেন কলেজের একজন প্রভাবশালী শিক্ষক। এছাড়াও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এই কলেজের বর্তমান ও সাবেক একাধিক শিক্ষক।
সূত্রটি জানায়, মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের শর্ত পূরণ করতে উক্ত শিক্ষকদের ডিগ্রি পর্যায়ে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারীর পূর্বে নিয়োগ দেখাতে পত্রিকায় ব্যকডেটে বিজ্ঞাপন ছাপাতে হয়েছে। এছাড়া ঐ সময় কলেজের গভর্নিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকদের স্বাক্ষরও অনুকরণ করে কারো দিয়ে নতুন করে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, উক্ত ১৪ জন শিক্ষকের মধ্যে মহিনুর ইসলাম বাংলা ও মোঃ মহিবুল্লাহ হিসাব বিজ্ঞানে বুধহাটা বিবিএম কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক হিসেবে ২০০৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর তারিখে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং সেখানে নিয়মিত উপস্থিত থেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন। সাতক্ষীরা দিবানৈশ কলেজে এমপিও ভুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা ঐ স্কুলে চাকুরী করেছেন। এছাড়া আরো কয়েকজন শিক্ষক এমপিও ভুক্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজে অনার্সের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সাতক্ষীরা সদরের বিভিন্ন কলেজে এমপিও বানিজ্যে প্রতি শিক্ষক ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা লেনদেন করার অভিযোগ রয়েছে। সব যোগ্যতা থাকার পরও টাকা ছাড়া অধিকাংশই এখন আর নিয়োগ পাচ্ছেন না।
তথ্য প্রদানকারীদের মধ্যে একজন শিক্ষক বলেন “ভাই আমার খুব বিপদে আছি,—- আমাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো হচ্ছে,—- থানা পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে,—- মুখ খুললে বিপদ বাড়বে,—- তাই আমার নাম ব্যবহার করবেন না।’
অভিযোগ সম্পর্কে সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ শফিকুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এমপিওভুক্তির বিষয়ে সব কিছু সঠিকভাবে করা হয়েছে। এসব শিক্ষকদের অনেক আগেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগে কোন জালিয়াতি নেই। তিনি অন্য সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন সবকিছু নিয়ম মেনেই করা হয়েছে।
কলেজের গভর্নিং কমিটির সভাপতি সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য মীর মোস্তাক আহমেদ রবি একটি দৈনিকের প্রতিনিধিকে বলেন, ‘এসব বিষয় প্রিন্সিপালকে কেন বলেন না? নিয়োগের বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। ভালো করে খবর নেন তারপর কথা বলেন।’ বলে ফোন কেটে দেন।

Related posts